আজ ১৭ই নভেম্বর মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ দিন তাকে নানাভাবে স্মরণ করছেন ভাসানীর অনুসারীরা। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন বাণী দিয়েছেন। এ ছাড়া বাণী দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
১৯৭৬ সালের ১৭ই নভেম্বর ঢাকার বিএসএমএমইউ (পিজি হাসপাতালে) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাওলানা ভাসানী মৃত্যুবরণ করেন। তাকে টাঙ্গাইলের সন্তোষে দাফন করা হয়। ১৮৮০ সালের ১২ই ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে ভাসানীর জন্ম। সিরাজগঞ্জে জন্ম হলেও জীবনের বড় অংশই সন্তোষে কাটিয়েছেন তিনি।
মাওলানা ভাসানী তার কৈশোর-যৌবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি তৎকালীন বাংলা-আসাম প্রদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। লাইন-প্রথা উচ্ছেদ, জমিদারদের নির্যাতন বিরোধী আন্দোলনসহ সারাজীবনই তিনি সাধারণ মানুষের কল্যাণে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। তার উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে কাগমারীতে অনুষ্ঠিত ‘ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন’ পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) রাজনীতিতে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
মাওলানা ভাসানী অধিকারবঞ্চিত, অবহেলিত ও মেহনতি মানুষের অধিকার এবং স্বার্থরক্ষায় আজীবন নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগ্রাম করে গেছেন। জাতীয় সংকটে জনগণের পাশে থেকে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি সবসময় ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতেন। ক্ষমতার কাছে থাকলেও ক্ষমতার মোহ তাকে কখনও আবিষ্ট করেনি। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন নির্মোহ, অনাড়ম্বর ও অত্যন্ত সাদাসিধে। শোষণ ও বঞ্চনাহীন, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন তিনি।
কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মজুর, কামার, কুমার, তাঁতি ও খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন মাওলানা ভাসানী। এ কারণে দেশের মানুষের অন্তরে জিইয়ে আছেন এই মজলুম জননেতা।
মাওলানা ভাসানী জাতীয় ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রবাদপুরুষ মাওলানা ভাসানী। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে উপ-মহাদেশের নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের পক্ষে আপসহীন ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন। মাওলানা ভাসানী দেশমাতৃকার মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি জনতার ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী ছিলেন এক আলোকবর্তিকা।

নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভাসানী ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসীন হননি। দেশের জাতীয় রাজনীতিতে ভাসানীর বংশের উত্তরাধিকারীরা ক্ষমতাসীন হতে পারেননি। যে কারণে বৃহৎ পরিসরে ভাসানীকে তুলে ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারা।
ভাসানী তার জীবদ্দশায় বলেছিলেন, ‘দারিদ্র্যকে দূর করিয়া দাও, শোষণকে উচ্ছেদ করিয়া দাও, সবার মুখে হাসি ফুটিতে দাও, তবেই আমার কাজ ফুরাইবে।’
ভাসানী অনুসারীরা মনে করেন, পশ্চিম পাকিস্তানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে ভাসানীই প্রথম পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ স্বাধীন করার হুংকার দিয়েছিলেন। অত্যাচারী শাসক ও শোষকের বিরুদ্ধে ভাসানীর ‘খামোশ’ উচ্চারণ সর্বকালে প্রাসঙ্গিক। ভাসানীর বলিষ্ঠ কণ্ঠের ভাষণ এখনও ভেসে বেড়ায় মানুষের হৃদয়ে।
কৈশোর-যৌবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ভাসানী। দীর্ঘদিন তিনি তৎকালীন বাংলা-আসাম প্রদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠনকারী প্রধান নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে গঠিত প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতিও ছিলেন তিনি।
ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল একত্রে পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষা এবং বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠা। তবে, তাঁদের রাজনৈতিক পথ কিছুটা আলাদা ছিল। শুরুতে, মুজিব এবং ভাসানী একসাথে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। ১৯৫০-৬০ দশকে তাঁরা উভয়েই পাকিস্তান সরকারের শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং পূর্ব পাকিস্তান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়েছেন। তবে ভাসানী বেশি বিপ্লবী এবং বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, যখন মুজিবপন্থীরা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজতেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বিশাল জয় লাভ করে। মুজিব একমাত্র নেতা হিসেবে বাঙালির প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। এই সময় ভাসানীর প্রভাব অনেকটা কমে যায়, তবে তাঁর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বাংলার জন্য তার সংগ্রাম এখনও মুজিবের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছিল।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভাসানী সরাসরি নেতৃত্বে ছিলেন না, কিন্তু তার বিপ্লবী চিন্তাভাবনা এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য তার দীর্ঘকালীন সংগ্রাম বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য এবং বাঙালির স্বাধীনতার পক্ষে বার বার আওয়াজ তুলেছিলেন।
ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে টাঙ্গাইল পৌর শহরের সন্তোষে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যাল, ভাসানী ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
আজ রোববার সকাল সাড়ে ৭টায় ভাসানীর মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আনোয়ারুল আজীম আখন্দ। এরপর ভাসানীর পরিবার, রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও মাওলানা ভাসানীর মুরিদান, ভক্ত ও অনুসারীরা মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং মোনাজাত করবেন।
এ ছাড়া দিবসটি উপলক্ষে আলোচনাসভা, মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, এতিম ও দুস্থদের মাঝে খাবার পরিবেশন করা হবে।
মাওলানা ভাসানীর ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি গঠিত ‘মাওলানা ভাসানী মৃত্যুবার্ষিকী পালন জাতীয় কমিটির’ উদ্যোগে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালনে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
আজ রাজধানীর ঢাকার কুড়িল যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে থেকে সাড়ে ৬টায় টাঙ্গাইলের উদ্দেশে যাত্রা, সেখানে পৌঁছে তার মাজার জিয়ারত, শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ। পরে মাজার চত্বরে টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির উদ্যোগে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় দিন ১৮ই নভেম্বর সকাল ১০টায় ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আলোচনাসভা। এ ছাড়া জেলায় জেলায় কর্মসূচি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভাসানী ফাউন্ডেশনের মহাসচিব মাহমুদুল হক সানু জানান, মাওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সন্তোষে ভাসানী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে (১১-১৭) নভেম্বর পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী ভাসানী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলার মুক্তমঞ্চে প্রতিদিন আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে।
