ঠাসা ভিড়ে ভরা সংবাদ সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। শুরুতে সামান্য নার্ভাস লাগার কথা বললেও, পরের মুহূর্তেই তিনি ফিরলেন চেনা রূপে—যেমনটা করে আসছেন গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। লাইমলাইট নিজের কেড়ে নেওয়া, সমালোচকদের এক হাত নেওয়া এবং অবসরের বাঁশি যে এখনই বাজছে না, তা পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া।
বৃহস্পতিবার ওয়েলসের বিরুদ্ধে উয়েফা নেশনস লিগের ম্যাচের আগে, বুধবার ‘পর্তুগাল ফুটবল সামিট’-এর মূল মঞ্চে কথা বলছিলেন ৪১ বছর বয়সী এই পর্তুগিজ অধিনায়ক। জাতীয় দলের নতুন কোচ হিসেবে হোর্হে হেসুসের যাত্রা শুরুর প্রাক্কালে রোনালদো স্পষ্ট জানান, দেশের হয়ে দেওয়ার মতো অনেক কিছুই এখনো বাকি রয়েছে তার।
গত বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে হেরে পর্তুগাল বিদায় নেওয়ার পর রবের্তো মার্তিনেজের স্থলাভিষিক্ত হন হেসুস।
ক্যারিয়ারে বর্তমানে ৯৭৯টি গোল রয়েছে রোনালদোর—যার মধ্যে ৮৩৩টি ক্লাব ফুটবলে এবং ১৪৬টি পর্তুগালের জার্সিতে। বহুল কাঙ্ক্ষিত ১ হাজার গোলের মাইলফলক ছুঁতে তার আর মাত্র ২১টি গোল প্রয়োজন। নেশনস লিগ জয় নাকি ১ হাজার গোলের কোটা পূরণ, কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এমন প্রশ্নের জবাবে মুচকি হেসে দুটিকেই বেছে নেন তিনি।
লিসবনের উপকণ্ঠে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনের সদর দপ্তরে সামিটে রোনালদো বলেন, ‘লক্ষ্য দুটিই অর্জন করা—১ হাজার গোলে পৌঁছানো এবং জাতীয় দলের হয়ে এই নেশনস লিগ জেতার চেষ্টা করা। নতুন ম্যানেজার হোর্হে হেসুসের সঙ্গে এটি একটি নতুন যুগ, যাকে আমরা সবাই খুব ভালো করে চিনি। আশা করি, তার পথচলা শুভ হবে।’
পর্তুগালের জার্সিতে ১ হাজারতম গোল করাকে ক্যারিয়ারের ‘স্বপ্নের ইতি’ বা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন রোনালদো। তার ভাষায়, ‘জাতীয় দলের হয়ে ১ হাজারতম গোলটি করা হবে অসাধারণ কিছুর সমাপ্তি—একটি সুন্দর গল্প। তবে এটা শেষ নয়, কেবল একটি সুন্দর অধ্যায়।’
তবে এই মাইলফলক ছোঁয়ার তাড়া থাকলেও তিনি এটি নিয়ে কোনো মানসিক চাপে নেই বলে জানান। ‘আমি আগেই স্বীকার করেছি যে আমি সেখানে পৌঁছাতে চাই, এবং আমি পৌঁছাব। তবে এটা কি কোনো নিয়োগ বা জেদ? একদমই না… বাকি বিষয় হলো সময়টাকে উপভোগ করা, প্রতিটি দিনকে সুন্দরভাবে কাটানো।’
বিশ্বকাপ থেকে পর্তুগালের বিদায়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছিলেন বলে জানান রোনালদো। তবে পর্তুগিজ ফেডারেশন এবং হেসুসের সঙ্গ আলোচনার পর তিনি খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
‘তারা আমার ওপর আস্থা রেখেছে। আমি এখনো বিশ্বাস করি জাতীয় দলকে সাহায্য করার সক্ষমতা আমার রয়েছে,’ রোনালদো যোগ করেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাঠের ভেতরের পারফরম্যান্স, গোল করা এবং দলকে ম্যাচ জিততে সাহায্য করা। যদি কোচ মনে করেন যে আমার প্রয়োজন নেই, তবে আমি আজকেই সরে যেতে পারি—কোনো সমস্যা নেই… যখন আমি মনে করব যে আমি এখানে কিছু দিতে পারছি না, মাঠে কোনো অবদান রাখতে পারছি না, গোল করতে পারছি না, কিংবা দলের পরিবেশ নষ্ট করছি—তখন আমি নিজেই প্রথম ব্যাগ গুছিয়ে নেব।’
অবসরের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে করা প্রশ্নটি স্বভাবসুলভভাবেই এড়িয়ে যান তিনি। ‘বয়স ত্রিশের শেষ কোঠায় পৌঁছানোর পর আমি একটি জিনিস শিখেছি—বর্তমানে বাঁচো, আগামীকালের কথা ভেবে সময় নষ্ট কোরো না। ১ হাজার গোল করা কি সম্ভব? হ্যাঁ। সম্ভাবনা অনেক বেশি? তাও হ্যাঁ। তবে শেষ পর্যন্ত কি তা ঘটবে? আমি জানি না।’
গণমাধ্যমের সমালোচনার মুখে রোনালদো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বছরের পর বছর ধরে তাকে ফুটবলের আঙিনা থেকে ‘মুছে ফেলার’ চেষ্টা করা হয়েছে।
তার কথায়, ‘এমন কিছু কখনোই ঘটতে দেওয়া হবে না—এমনকি শটগান দিয়ে চেষ্টা করলেও না। কারণ আমি এখনো দারুণভাবে সেই গুলি এড়িয়ে চলতে জানি।’
১ হাজার গোলের মাইলফলক থেকে হয়তো তিনি ২১টি গোল দূরে রয়েছেন এবং অবসরের দরজাও হয়তো আগের চেয়ে কাছাকাছি, তবে আপাতত রোনালদো অবস্থান করছেন ঠিক সেখানেই, যেখানে তিনি থাকতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন: পর্তুগালের লাল-সবুজ জার্সিতে, ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে আর মুখে হাসি নিয়ে একের পর এক সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে।
