❐ নিজস্ব প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে বিশিষ্ট হিন্দু ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা সজীব রঞ্জন দাশের মালিনাকানাধীন সিনথিয়া সিএনজি স্টেশন দখল নিতে তালা দিয়েছে প্রভাবশালী একটি চক্র। চক্রটি এর আগে সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরের চরনারচরের হিন্দু জমিদারের জায়গাও দখল করেছিল।
এবার বুধবার রাতে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক, সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সহসভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য কানাডাপ্রবাসী ব্যবসায়ী সজীব রঞ্জন দাশের মালিকানাধীন সিনথিয়া সিএনজি স্টেশন জোরপূর্বক তালা দিয়েছে। এতে জেলা বিএনপির প্রভাবশালী একটি দখলবাজ চক্র ইন্ধন দিচ্ছে বলে শহরে খবর চাওর হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সন্ধ্যায় সুনামঞ্জের মল্লিকপুরে অবস্থিত সিনথিয়া সিএনজি স্টেশনে মালিকের কাছে টাকা পায় এই অভিযোগ তুলে তেঘরিয়ার বাসিন্দা শাকিল ও পাম্পের সাবেক ম্যানেজার ও ইঞ্জিনিয়ার জুয়েল আহমদ ক্যাডার নিয়ে পাম্পে তালা দিতে আসে। এসময় পাম্পে কর্মরত কর্মচারীদের মারধরও করে তারা। পরে নিজেরাই তালা দিয়ে দেয় পাম্পে।
এসময় প্রতিবাদ করলে পাম্পে কর্মরত কর্মচারীদের মারধর করার পাশাপাশি মূল্যবান জিনিসপত্রও নিয়ে যায় তারা। কর্মচারী ও মালিককে অকথ্য ভাষায় গালাগালিও করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাম্পের ম্যানেজার ও ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন জুয়েল আহমদ। ২০২৪ সালের ২৬শে জুলাই থেকে কানাডায় আছেন মালিক সজীব রঞ্জন দাস। এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ইকে ৪০০১৩৭১০২ ফ্লাইটে কানাডায় যান তিনি।
মালিক আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় ৫ই আগস্টের পর ইউনূস সরকারের সময়ে পাম্প দখল করতে নানা ফন্দি আটে ম্যানেজার জুয়েল। সে তার সহপাঠী তেঘরিয়ার বাসিন্দা শাকিলের সঙ্গে আঁতাত করে পাম্প দখল নিতে প্রায়ই পরামর্শ করে।
মালিক সজীব রঞ্জন দাশ কানাডা থাকলেও তার স্বাক্ষর জাল করে পাম্পের ব্যাংক চেকে শাকিলের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছেন বলে একটি জাল চেক সৃজন করে জুয়েল ও সাকিল চক্র। এই ভুয়া চেক দেখিয়ে এখন শাকিল ও জুয়েল পাম্প দখল নিতে বুধবার ক্যাডার নিয়ে এসে পাম্প তালা দিয়ে যায়।
এদিকে ম্যানেজার জুয়েল আহমদের এই ষড়যন্ত্র আরো ধরা পড়ে জালালাবাদ গ্যাসকে পাম্পের গ্যাসের মূল্য পরিশোধ নিয়ে। প্রতারণা ও ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে মালিক জুয়েল মিয়াকে অপসারণ করে তার স্থলে আরিফ নামে একজনকে দায়িত্ব দেন। এরপর থেকেই জুয়েল বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সে তার বন্ধু শাকিলের শরণাপন্ন হয়ে কানাডায় অবস্থানরত পাম্প মালিকের স্বাক্ষর জাল করে চেক সংগ্রহ করে গ্যাস পাম্প মালিক সাকিলের কাছ থেকে চেকে টাকা নিয়েছেন বলে জাল চেক সৃজন করে।
জানা গেছে, মালিকের অবর্তমানে ম্যানেজার জুয়েল পাম্পের টাকা তছরুপ করতে ২০২৫ সালের ১৬ই অক্টোবর জালালাবাদ গ্যাসকে যে ৪৬ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছে বলে হিসেবে তুলেছে সেটাও ভুয়া।
জালালাবাদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি। ২০২৪ সালের ২৭শে জুন একইভাবে জালালাবাদ গ্যাসের অনুকুলে ব্যাংকে ২৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা ৯৯৭ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে হিসেব দিলেও ওইদিন ব্যাংকে ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা হয়েছিল। ১৬ লাখ ৩৭ হাজার ৯৯৭ টাকা জালালাবাদ গ্যাসের হিসেবে জমা পড়েনি।
এভাবে ২০২৪ সালের ২রা জুলাই ম্যানেজার জুয়েলের হাতে লেখা স্লিপে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় পাম্পের পূবালি ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে জালালালাবাদ গ্যাসের অ্যাকাউন্টে ৩৫ লাখ টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছে। কিন্তু জালালাবাদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ওই হিসেবেও ওইদিন তাদের হিসেবে কোনও টাকা জমা পড়েনি।
এভাবে ম্যানেজার মালিকের অনুপস্থিতিতে পাম্পের প্রায় কোটি টাকা নানাভাবে তছরুপ করে। ভুয়া লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসলে কর্তৃপক্ষ ম্যানেজারের আত্মীয়-স্বজন ও অভিভাবকদের ডেকে এনে বিচার শালিস করিয়ে তার কাছে পাম্পের প্রায় কোটি টাকা পাওনা বলে সাব্যস্ত হয়। এই টাকা কিস্তিতে দিতে স্বীকার করে একটি কিস্তি পরিশোধও করে জুয়েল।
এরমধ্যে তার বন্ধু শাকিলের কাছ থেকে পাম্পের চেকে মালিক সজীব রঞ্জন দাশের স্বাক্ষর জাল করে চেক এনে পাম্পকে পাওনাদার প্রতিষ্ঠিত করে। এভাবে পাম্প দখল করতে শাকিলকে নিয়ে পাম্পে তালা দিয়েছে জুয়েল গং।
অভিযুক্ত শাকিল বলেন, আমি তালা দেইনি। তালা দিয়েছে সাবেক ম্যানেজার জুয়েল। আমি পাম্প মালিকের স্বাক্ষরিত চেকে টাকা পাই। স্বাক্ষর দেওয়া চেকের তারিখের সময়ে মালিক কানাডা থেকে কীভাবে স্বাক্ষর দিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা মালিকের ম্যানেজার জুয়েল জানে।
পাম্প মালিক সজীব রঞ্জন দাশ বলেন, ২০২৪ সালের ২৬শে জুলাই থেকে আমি কানাডা। আমি কীভাবে স্বাক্ষর দেব? চেক দেব? জুয়েল যেভাবে জালালাবাদ গ্যাসে টাকা ট্রান্সফারের নামে ভুয়া কাগজ তৈরি করে প্রতারণা করেছে এটাও এভাবে করেছে। এই চেকের বিষয়ে আমি কিছু জানিনা। আমি কাউকে চেক দেইনি। আমার অনুপস্থিতিতে ম্যানেজার ও শাকিল ষড়যন্ত্র করে পাম্প দখল করতে এই জাল চেক সৃজন করেছে। আমি এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি তদন্ত আরিফ উল্লা বলেন, আমরা উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে কাগজপত্র পর্যালোচনা করে আইনী ব্যবস্থা নেব। তবে মালিক কর্তৃপক্ষকে পাম্প খুলে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি।
