‘নানা অজুহাতে’ ২ বছর অচল করে রাখা হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের গড়া মহেশখালীর পাইপলাইন, কিস্তি গুনছে বিপিসি

‘নানা অজুহাতে’ ২ বছর অচল করে রাখা হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের গড়া মহেশখালীর পাইপলাইন, কিস্তি গুনছে বিপিসি
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে কক্সবাজারের মহেশখালীতে বঙ্গোপসাগরের তলদেশ দিয়ে ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। বড় জাহাজ থেকে সরাসরি তেল খালাস করে পাইপলাইনের মাধ্যমে তীরে থাকা সংরক্ষণাগারে পৌঁছে দেওয়াই ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

কিন্তু ২০২৪-এর ৫ই আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতায় এই পাইপলাইন নিয়ে শুরু হয় নানা তালবাহানা। অপারেটর নিয়োগ না দিয়ে দুই বছরের বেশি সময় ধরে অলস ফেলে রাখা হয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প।

এদিকে প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধও শুরু হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত বিপিসি ৩ হাজার ৭৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৬৯০ কোটি টাকার কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যেই প্রকল্পের কারিগরি ত্রুটি মেরামতের জন্য নির্ধারিত ১৮ মাসের গ্যারান্টির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

এসপিএম চালু হলে বছরে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই সুবিধা এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

একই সঙ্গে বড় ট্যাংকার থেকে তেল খালাসের ১১ দিনের প্রক্রিয়াকে কয়েক ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যও পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি।

৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পকে দেশের প্রথম সমন্বিত সমুদ্র ও স্থলভিত্তিক তেল সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তরের ধীর ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া কমানোর লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৮ সালের আগস্টে কক্সবাজারে প্রকল্পটির কাজ শুরু করে বিপিসি।

ইন্সটলেশন অব সিঙ্গেল মুরিং বা এসপিএম পদ্ধতিতে বড় আকারের ট্যাংকার সাগরে স্থাপিত একটি ভাসমান বয়ার সঙ্গে নোঙর করতে পারে। এরপর ওই বয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল সরাসরি সমুদ্রের নিচে থাকা পাইপলাইনে পাঠানো হয়। এই ব্যবস্থায় তেল খালাসের সময় কমিয়ে প্রায় ৪৮ ঘণ্টায় আনার কথা রয়েছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড

প্রকল্পের আওতায় একটি ভাসমান বয়া এবং সমুদ্র ও স্থলভাগ মিলিয়ে ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি সমান্তরাল পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এর একটি দিয়ে অপরিশোধিত তেল এবং অন্যটি দিয়ে ডিজেল পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে।

মহেশখালীর কালারমারছড়ায় নির্মিত ছয়টি ট্যাংকের সঙ্গে পাইপলাইনগুলো যুক্ত করা হয়েছে। এসব ট্যাংকের তিনটি অপরিশোধিত তেল এবং বাকি তিনটি ডিজেল সংরক্ষণের জন্য ব্যবহারের কথা। পরে পৃথক পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব জ্বালানি চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় চীনের সহজ শর্তের ঋণ, সরকারি অর্থ এবং বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের নির্মাণকাজ করেছে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি)।

বড় পরিমাণে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরি করে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করাও প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল। পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ধরনের সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব কমিয়ে আনার লক্ষ্যও ছিল।

কিন্তু ৫ই আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ডামাডোলে শেখ হাসিনার সরকারের সময় গৃহীত অসংখ্য কল্যাণমুখী প্রকল্প বন্ধ করে দেয় ক্ষমতাসীনরা, নানা অজুহাতে। ফলে ২০২৪ সালের মার্চে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও পরবর্তীতে স্থবির হয়ে যায় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য জরুরি এই প্রকল্পটিও।

২০২৪-এর মার্চেই মাসেই প্রকল্পটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। গভীর সমুদ্রের জাহাজ থেকে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল খালাস করে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানোও হয়। যার ফলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রকল্পটি যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন ও সফলতার হার ছিল শতভাগ।

কিন্তু ২০২৪-এর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ক্ষমতারোহান করা ইউনূস সরকার এবং পরবর্তী বিএনপি সরকার এই প্রকল্পটি সচল করা নিয়ে যেন একেবারেই আগ্রহী নয়।

২০২৪ সালের ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনূস। ওই মাসেই সিপিপিইসিকে প্রকল্প বুঝে নেওয়ার সনদ দেয় বিপিসি। তবে এরপরও প্রকল্প পরিচালনার জন্য স্থায়ী কোনো অপারেটর নিয়োগ করা হয়নি।

 

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, শুরুতে প্রকল্পটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিপিপিইসিকে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।

২০২৫ সালের এপ্রিলে অপারেটর নিয়োগের জন্য প্রথমবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বিপিসি। ওই দরপত্রে একজন দরদাতা কারিগরিভাবে যোগ্য বিবেচিত হলেও তার প্রস্তাব বিপিসির প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ৫১ শতাংশ বেশি ছিল। এ কারণে দরপত্রটি বাতিল করা হয়।

এরপর সরকার-টু-সরকার বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে এসপিএম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি নিয়মিত কার্যক্রমে যেতে পারেনি।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৯শে ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে বিপিসি। দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি করা হয়। ওই দফায় ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের কাগজ কিনলেও শেষ পর্যন্ত তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ইন্দোনেশিয়ার পিটি পের্তামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টাল, চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি) এবং হংকংভিত্তিক হিলং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং (হংকং) লিমিটেড।

দরপত্র মূল্যায়নের কাজে বিপিসিকে সহায়তা করে আবুধাবিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স।

বিপিসির নথি অনুযায়ী, পাঁচ বছরের জন্য এসপিএম পরিচালনার দায়িত্ব পিটি পের্তামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টালকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মূল দর ছিল ১২৮ মিলিয়ন ডলার।

আয়কর ও মূল্য সংযোজন করসহ (ভ্যাট) চুক্তির মোট মূল্য দাঁড়ায় ১৫৯ দশমিক ১৩৫ মিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা বিনিময় হার হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।

জুলাইয়ে বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান পিটি পের্তামিনা ট্রান্স কনটিনেন্টালকে নিয়োগের অনুমোদন চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে প্রস্তাব পাঠান। মূল্যায়ন কমিটি প্রতিষ্ঠানটিকে কারিগরিভাবে যোগ্য এবং সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ওই সময় পর্যন্ত বিপিসি প্রতিষ্ঠানটিকে কাজের আদেশ দেয়নি।

১৫ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে বিপিসির সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানান, অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া ‘প্রায় চূড়ান্ত’ পর্যায়ে রয়েছে এবং শিগগিরই তা সম্পন্ন হবে।

অপারেটর নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে সিপিপিইসির দেওয়া ১৮ মাসের ত্রুটি-দায়বদ্ধতার মেয়াদ চলতি বছরের আগস্টে শেষ হয়ে যায়। অথচ এসপিএম তখনও নিয়মিত কার্যক্রমে যায়নি। ফলে এসপিএমে কোনো কারিগরি ত্রুটি বা যন্ত্রপাতিতে সমস্যা দেখা দিলে এখন তার মেরামতের ব্যয় বিপিসিকেই বহন করতে হবে। গ্যারান্টির মেয়াদ কার্যকর থাকলে এসব ব্যয় সিপিপিইসির দেওয়া গ্যারান্টির আওতায় পড়ত।

এসপিএম নিয়মিতভাবে চালু না হওয়ায় বিপিসি এখনো পুরোনো পদ্ধতিতে ছোট জাহাজ ব্যবহার করে তেল পরিবহন করছে। একই সঙ্গে নতুন এই স্থাপনা নির্মাণের পরও প্রত্যাশিত মাত্রায় সাশ্রয়ের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রাথমিক হিসাবে এসপিএম চালু হলে বছরে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে জানিয়েছিল বিপিসি। তবে বর্তমানে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে সংস্থাটি ধারণা করছে, নিয়মিতভাবে এসপিএম চালু হলে বছরে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, দুই বছর বিলম্বের কারণে সম্ভাব্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সাশ্রয় করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। কারণ এখনো বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে সমুদ্রে তেল স্থানান্তরের প্রচলিত পদ্ধতি চালু রয়েছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেছেন, এত বড় সরকারি বিনিয়োগের পরও এসপিএম চালু না হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ঘটনায় যারা দায়ী, সরকারি নথিতে তাদেরও চিহ্নিত করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, তেল খালাসে বিলম্বের কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তারও হিসাব করা দরকার। ঠিকাদারের ১৮ মাসের গ্যারান্টির আওতায় থাকা যেসব ত্রুটি মেরামতের ব্যয় এখন বিপিসিকে বহন করতে হবে, সেসব খরচও হিসাব করে দায়ীদের কাছ থেকে আদায়ের ব্যবস্থা করা উচিত।

এসপিএম পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রস্তাবটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে তোলা হতে পারে বলে জানান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জ্বালানি বিষয়ক যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী।

প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত আরেক কর্মকর্তা জানান, পরবর্তী বৈঠকেই প্রস্তাবটি কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হতে পারে।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সর্বশেষ দরপত্রে এসপিএম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পের্তামিনাকে নির্বাচিত করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের জন্য পের্তামিনার সর্বশেষ দর প্রায় ১২৮ মিলিয়ন ডলার।

Visited 4 times, 1 visit(s) today