হামে একদিনে ঝরল আরও ১১ শিশুর প্রাণ: টিকাদানের ৩ সপ্তাহে অ্যান্টিবডি তৈরির কথা, ৬ মাসেও কমেনি সংক্রমণ, মান প্রশ্নবিদ্ধ

হামে একদিনে ঝরল আরও ১১ শিশুর প্রাণ: টিকাদানের ৩ সপ্তাহে অ্যান্টিবডি তৈরির কথা, ৬ মাসেও কমেনি সংক্রমণ, মান প্রশ্নবিদ্ধ
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১১৩ এবং উপসর্গ দেখা গেছে এক হাজার ১৫৭ শিশুর শরীরে।

আজ ২৩শে সেপ্টেম্বর, বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৫ই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১ হাজার ৭৬ জনে। এদের মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০১ ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ১৫৭ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে মোট সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়াল এক লাখ ৮৩ হাজার ৪৪৯ জনে।

এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১১৩ জন। এ নিয়ে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ২০ হাজার ৮৫১ জনে।

গত ১৫ই মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৮ জন। একই সময়ে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এক লাখ ৫৫ হাজার ৬১২ জন।

টিকাদানের পরেও কেন এত মৃত্যু?

হামের টিকা গ্রহণের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু এখনও সংক্রমণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। এই পরিস্থিতিতে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদরা।

টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না তা যাচাইয়ের বারবার পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার তা আমলে নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

দেশব্যাপী হামের প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ার পর গত ৫ই এপ্রিল উচ্চ সংক্রমিত উপজেলাগুলোতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। প্রথম দফায় ১৮ জেলার ৩০ উপজেলা ও পৌরসভায় টিকা দেওয়া হয়। দুই সপ্তাহ পর ২০শে এপ্রিল শুরু হয় দেশব্যাপী কার্যক্রম।

সরকার ছয় থেকে নয় মাস বয়সি ১ কোটি ৯০ লাখ পাঁচ হাজার ৯৫০ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ই মে শতভাগ কাভারেজ অর্জিত হয়। ২০শে মে পর্যন্ত চলা এই কার্যক্রমে মোট দুই কোটি ২৪ হাজার ১১৭ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ শতাংশ বেশি। তবে এত বেশি কাভারেজের পরও সংক্রমণ কমেনি।

গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে আরও ৯৬৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে এবং ৮০ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ১৫ই মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪৮ এবং নিশ্চিত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৫২৭।

এই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৯ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪০৫ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত এ পরিসংখ্যানে বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরা এতে বেশি আক্রান্ত হয়। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়।

টিকার মান ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন

লক্ষ্যমাত্রার বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু না কমায় টিকার কার্যকারিতা ও সংরক্ষণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, টিকার কার্যকারিতা নির্ভর করে শিশুর বয়স, পুষ্টি ও মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর। বয়স যত কম, টিকার কার্যকারিতা তত কম।

সরকারের ইপিআই ও আইসিডিডিআর,বিতে দীর্ঘদিন কাজ করা টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তাজুল ইসলাম এ বারী গত ১২ই জুলাই বলেছিলেন, ‘টিকাদানের দুই মাস হয়ে গেল, এখনও উচ্চ সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এই মুহূর্তে জরুরি হলো বয়সভিত্তিক ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাসের পর থেকে দুই বছর এবং পাঁচ বছরের নিচের টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যে, আসলে হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না।’

‘একই সঙ্গে কিছু অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও সেটি রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতার পর্যায়ে রয়েছে কি না, তা-ও দেখতে হবে। কিন্তু সরকার সে ব্যাপারে কোনো পরামর্শই কানে তুলছে না’, বলেন তিনি।

বয়সভেদে টিকার কার্যকারিতার হার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সাধারণত ছয় থেকে নয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে টিকার কার্যকারিতার হার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ। নয় মাস থেকে দেড় বছরের মধ্যে ৮৫ শতাংশ এবং চার থেকে ছয় বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতার সম্ভাবনা ৯৭ শতাংশ। কাজেই টিকার সঙ্গে বয়সের একটা বিরাট সম্পর্ক রয়েছে।’

কার্যকারিতা যাচাইয়ের দাবি

টিকার কার্যকারিতা যাচাইয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, ‘সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন ন্যাশনাল কন্ট্রোল ল্যাবরেটরিতে (এনসিএল) টিকা পরীক্ষা করা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘পরিবহনে কোথাও কোল্ড চেইনে সমস্যা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে আইইডিসিআরকে কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে টিকার মান যাচাইয়ে পরীক্ষার কিট দিতে বলতে হবে। কিন্তু সরকার এগুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে এখনও শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে, আর আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ গত ১২ই জুলাই বলেছিলেন, ‘এখনও প্রতিনিয়ত সংক্রমণ হচ্ছে। অথচ টিকাদানের ৯ সপ্তাহ হয়ে গেছে। কাজেই আদৌ শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা দেখা দরকার।’

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, ‘টিকার কাভারেজ শতভাগ হলেও হয়তো দেখা যাবে কোনো একটা জনগোষ্ঠী বাদ গেছে। সেখান থেকে ছড়াতে পারে। এখন টিকার কার্যকারিতা আদৌ রয়েছে কি না তা পরীক্ষা না করলে বোঝা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে যেহেতু আলোচনা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে ভেবে দেখা যেতে পারে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘বিষয়টি ভাবনায় আছে। কিন্তু এখনও কিছু করা যায়নি। সংক্রমণ কমে আসবে এটাই চিন্তা ছিল। যেহেতু তা হয়নি, তাই বিষয়টি নিয়ে মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলব।’

Visited 6 times, 1 visit(s) today