জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বহুমুখী চাপে রপ্তানিকারকেরা, বিপর্যস্ত অর্থনীতি

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বহুমুখী চাপে রপ্তানিকারকেরা, বিপর্যস্ত অর্থনীতি
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় একসঙ্গে কয়েক দিক থেকে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্পে। পণ্য কারখানা থেকে বন্দরে নেওয়া, বন্দর ও আইসিডিতে হ্যান্ডলিং, আমদানি করা কাঁচামাল পরিবহন এবং কারখানায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের ব্যবহার—সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে এই বাড়তি ব্যয় বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করার সুযোগ সীমিত। ফলে রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠছে।

জ্বালানি তেলের সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির পর ইতিমধ্যে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে। চট্টগ্রামের বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) ও অফ-ডকগুলো বিভিন্ন সেবার চার্জ বাড়িয়েছে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। বন্দর অপারেটররাও বিদ্যমান চুক্তির দর সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে। ফলে রপ্তানি পণ্যের কারখানা থেকে বন্দরে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় নতুন করে ব্যয় যোগ হচ্ছে।

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে তাঁদের সামনে মূল সমস্যা হচ্ছে বাড়তি ব্যয় কোথায় সমন্বয় করবেন। বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে আগে নির্ধারিত দরে অর্ডার নেওয়া থাকায় হঠাৎ করে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লেও সেই বাড়তি খরচ পুরোপুরি পণ্যের দামে যোগ করা যায় না। ফলে ব্যয়ের একটি বড় অংশ উদ্যোক্তাকেই বহন করতে হচ্ছে।

একসঙ্গে বাড়ছে সব ধরনের খরচ

বাংলাদেশ কভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ বলেন, ঢাকা রুটে আগে প্রতি যাত্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকায় প্রাইম মুভার চালানো যেত। এখন ন্যূনতম ভাড়া ২৬ হাজার টাকা নিতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত প্রাইম মুভারে আপ-ডাউন প্রতি ট্রিপে জ্বালানি, চালক ও সহকারীর বেতনসহ ব্যয় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকায় উঠেছে বলে জানান তিনি।

রপ্তানিকারকদের জন্য বিষয়টি শুধু পরিবহন ভাড়া বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর পর কনটেইনার হ্যান্ডলিং, স্টাফিং, ওজন পরিমাপসহ বিভিন্ন সেবার খরচও বাড়ছে।

চট্টগ্রামের ২৩টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো ও অফ-ডকে বিভিন্ন কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও পরিবহন চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা)।

বিকডার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কনটেইনার পরিবহনে ব্যবহৃত প্রাইম মুভারসহ পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ডিজেলনির্ভর। ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা নির্ধারণের পর বাড়তি পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় এ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।

রপ্তানিমুখী প্রায় ৯৩ শতাংশ পণ্য এসব বেসরকারি অফ-ডকের মাধ্যমে হ্যান্ডলিং হয়। ফলে আইসিডির বাড়তি চার্জও রপ্তানিকারকদের জন্য সরাসরি অতিরিক্ত ব্যয়ে পরিণত হচ্ছে।

বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে বাড়তি দাম নেওয়া কঠিন

রপ্তানিকারকদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে, দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম ইচ্ছামতো বাড়ানোর সুযোগ নেই।

এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, জ্বালানি ব্যয় বাড়ার প্রভাব শিল্পের সব স্তরে পড়েছে। ট্রাক ভাড়া ও লজিস্টিক চার্জ বেড়েছে। একই সঙ্গে কাঁচামাল আমদানির ব্যয়ও বেড়েছে।

লোডশেডিংয়ের সময় ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন চালাতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তখন এমনিতেই উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। ডিজেলের দাম বাড়ায় এখন সেই ব্যয় আরও বাড়বে।

মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, ‘কিন্তু এই ব্যয় আমাদের তৈরি পোশাকের ক্রেতা থেকে আদায় করা সম্ভব নয়। এটি তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতায়ও বাংলাদেশি উৎপাদককে পেছনে ঠেলে দিয়েছে।’

অর্থাৎ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু চলতি মাসের খরচ বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। রপ্তানিকারকদের মুনাফার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি নতুন দরপত্রে প্রতিযোগিতা করা, বিদ্যমান ক্রেতা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের সঙ্গে তাল মেলানোর ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

বন্দরের খরচও বাড়ছে

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত বার্থ অপারেটররাও বিদ্যমান চুক্তির দর সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, চার বছর আগে নির্ধারিত দর দিয়ে বর্তমান পরিচালন ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন গত সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ দাবি জানায়।

অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান চুক্তির দরপত্র জমা দেওয়ার সময় ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ৮০ টাকা। এখন তা ১৩০ টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৬৯ শতাংশ বেড়েছে।

তিনি বলেন, প্রত্যেক বার্থ অপারেটরের ৩০ থেকে ৪০টি ট্রেইলার রয়েছে। এ ছাড়া ভারী যন্ত্রপাতিগুলোও ডিজেলচালিত। মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবহন খাতে যায়। ফলে বিদ্যমান চুক্তিকৃত দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

বন্দর অপারেটরদের ব্যয় সমন্বয়ের দাবি বাস্তবায়িত হলে রপ্তানিকারকদের লজিস্টিক ব্যয়ের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

পরিবহন ভাড়াতেও বড় ধাক্কা

স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। বেনাপোল থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রাকের ভাড়া এক দিনের ব্যবধানে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

১৫ টন পণ্য নিয়ে বেনাপোল থেকে ঢাকায় যাওয়ার ভাড়া ২১ থেকে ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা হয়েছে। বেনাপোল-চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩৪ থেকে ৩৫ হাজার টাকা হয়েছে।

রপ্তানি ও আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে এই বাড়তি পরিবহন ব্যয় সরাসরি ব্যবসায়িক ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

করভো বাইসাইকেল লিমিটেড ও ট্রাইডেন্ট সাইকেলস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ বখতিয়ার জামাল বলেন, পরিবহন, বন্দর এবং আমদানি-রপ্তানি–সংশ্লিষ্ট সব খরচই বাড়ছে।

তাঁর ভাষ্য, বিশ্ববাজারে বাইসাইকেল খাত দীর্ঘদিন নিম্নমুখী থাকার পর এখন ঊর্ধ্বমুখী। এই সময়ে ব্যয় বাড়লে খাতটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় প্রভাব পড়বে।

নৌপথেও বাড়তে পারে ব্যয়

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের ৩৪টি নৌরুটে ১ হাজার ২০০টির বেশি লাইটার জাহাজ পণ্য পরিবহন করে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই পরিবহনেও ভাড়া সমন্বয়ের আলোচনা চলছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে জ্বালানির দাম ১৫ শতাংশ বাড়ার পর লাইটার জাহাজের ভাড়া ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করেছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এবারও ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সমন্বয় কমিটির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, জ্বালানি তেলের বর্ধিত দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্য পরিবহনের ভাড়া সমন্বয় করা প্রয়োজন।

ফলে সড়ক ও নৌ—দুই পথেই পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কারখানায়ও বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

রপ্তানিকারকদের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ উৎপাদন ব্যয়। গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ কম থাকায় যেসব কারখানাকে বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হয়, তাদের ব্যয় এখন আরও বাড়ছে।

পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমির হোসেন সোহেল বলেন, ডিজেলের ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদন থেকে গ্রাহক পর্যন্ত পুরো চেইনে পড়েছে।

কাচ তৈরির ফার্নেস অবিরাম চালাতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ না পেলে ডিজেল দিয়ে ফার্নেস চালু রাখতে হয়। পাশাপাশি কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য ডিজেলচালিত ক্রেন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিও ব্যবহার করা হয়।

ইস্পাত উৎপাদনকারী বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিকল্প হিসেবে জ্বালানি তেল দিয়ে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, গ্যাস না থাকলে উৎপাদন ব্যয় আগে স্বাভাবিকের তুলনায় চার গুণ বেশি হতো, এখন তা পাঁচ গুণ বেশি হবে। পাশাপাশি সারা দেশে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। পণ্য পরিবহনের ভাড়া প্রায় ১০ শতাংশ বাড়াতে হয়েছে।

বাড়তি ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত কার ওপর

রপ্তানিকারকদের বক্তব্য ও পরিবহন খাতের ব্যয় বৃদ্ধির তথ্য বলছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব একটি খাতের মধ্যে আটকে নেই। কারখানায় উৎপাদন থেকে শুরু করে কাঁচামাল আনা, পণ্য পরিবহন, বন্দর ও আইসিডিতে হ্যান্ডলিং—প্রতিটি ধাপে নতুন ব্যয় যুক্ত হচ্ছে।

রপ্তানিকারকদের জন্য এর বিশেষ ঝুঁকি হলো, এসব বাড়তি ব্যয় পণ্যের রপ্তানি মূল্যে পুরোপুরি যোগ করা কঠিন। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সাধারণত একাধিক দেশের সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য নেওয়ার সুযোগ রাখেন। ফলে দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারেন না।

এ অবস্থায় বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ উদ্যোক্তাদের মুনাফা থেকে সমন্বয় করতে হলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সক্ষমতায়ও চাপ তৈরি হতে পারে। আবার পুরো ব্যয় পণ্যের দামে যোগ করার চেষ্টা করলে আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার চাপ বাড়তে পারে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বাইসাইকেল ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে একই সময়ে কাঁচামাল, জ্বালানি, পরিবহন ও বন্দর ব্যয় বাড়লে মোট উৎপাদন ব্যয়ের ওপর তার প্রভাব জমতে থাকে।

ফলে সর্বশেষ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি রপ্তানিকারকদের জন্য শুধু একটি অতিরিক্ত খরচের বিষয় নয়; বরং উৎপাদন ব্যয়, মুনাফা, মূল্য নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই নতুন চাপ তৈরি করছে।

Visited 2 times, 2 visit(s) today