নিজস্ব প্রতিবেদক
মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার এখনো পুরোপুরি খোলেনি, আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা বাতিল নিয়ে চলছে তথ্য সংগ্রহ ও কূটনৈতিক তৎপরতা—এর মধ্যেই এক কোটি দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর কথা বলছে মন্ত্রণালয়
একদিকে মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা শ্রমবাজার এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি, অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভিসা বাতিলের বিষয়েও চলছে সমাধানের চেষ্টা। এমন বাস্তবতার মধ্যেই আগামী দিনে এক কোটি দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
বুধবার গোপালগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষকে দক্ষ করে গড়ে তুলে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে চায় সরকার। কোন দেশে কী ধরনের কাজের সুযোগ রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দেশের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী প্রস্তুত করার কথাও জানান তিনি।
তবে প্রশ্ন উঠছে—বিদ্যমান বড় শ্রমবাজারগুলোর জটিলতাই যেখানে এখনো পুরোপুরি কাটেনি, সেখানে এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর এই বিশাল লক্ষ্য বাস্তবায়ন হবে কীভাবে?
মালয়েশিয়ার দরজা এখনো পুরোপুরি খোলেনি
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে সেখানে নতুন বাংলাদেশি কর্মী প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। শ্রমবাজার পুনরায় চালুর জন্য বাংলাদেশ সরকার কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৪ জুন মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে ডিও চিঠিও পাঠানো হয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
এর আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও যেতে না-পারা ৭ হাজার ৮৭৩ জন কর্মীর মধ্যে একটি অংশকে সরকারি উদ্যোগে বোয়েসেলের মাধ্যমে পাঠানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রথম দফায় ৬০ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় যান।
কিন্তু নতুন করে কর্মী পাঠানোর বাজারটি এখনো স্বাভাবিকভাবে উন্মুক্ত হয়নি। চলতি বছরও মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি না দেওয়া পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য কোনো এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি বা আর্থিক লেনদেন না করতে কর্মপ্রত্যাশীদের সতর্ক করেছে।
সেপ্টেম্বরেও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেছে। সংগঠনটির সদস্যদের অভিযোগ, শ্রমবাজার চালুর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আমিরাতে ভিসা বাতিল নিয়েও অনিশ্চয়তা
সংযুক্ত আরব আমিরাতেও বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ভিসা বাতিল হওয়া বাংলাদেশিদের তথ্য সংগ্রহে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে এবং একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।
ভিসা বাতিলের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য এসেছে। জুলাইয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছিলেন, ৫ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিলের খবর সঠিক নয়; বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী সংখ্যা ৬২৬। পরে সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর প্রায় ৪ হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিলের বিষয়টি কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে জানান। ফলে সংখ্যার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির একটি পরিষ্কার ও একক চিত্র জনসমক্ষে নেই।
এ অবস্থায় আমিরাতে কর্মরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও প্রবাসীরাও ভিসা জটিলতা দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। আগস্টে তাদের এক সংবাদ সম্মেলনে ভিসা বাতিলের কারণে বাংলাদেশে আটকে থাকা প্রবাসীদের পুনরায় কর্মস্থলে ফেরানোর ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়।
এক কোটি কর্মীর লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়নযোগ্য?
সরকারের পক্ষ থেকে এক কোটি দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য সামনে রাখা হয়েছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষতা উন্নয়ন, বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা নির্ধারণ এবং দালালদের দৌরাত্ম্য কমানোর কথা বলেছেন প্রতিমন্ত্রী। BMET-এর কার্যক্রম অনলাইনে আনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
কিন্তু বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশ যে কয়েকটি প্রচলিত শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল, সেসব বাজারে সংকট থাকলে নতুন লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ কতটা মসৃণ হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৫১৯ জন কর্মী বিদেশে গেছেন বলে সংসদে জানানো হয়েছিল।
এই হিসাবে এক কোটি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য কেবল সংখ্যাগতভাবে বড় নয়; এর জন্য প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, দক্ষ কর্মী প্রস্তুত করা এবং বিদ্যমান বাজারগুলোর সংকট সমাধান—সবগুলো ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক অগ্রগতি প্রয়োজন।
তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার পুরোপুরি চালু করা, আমিরাতে ভিসা জটিলতা নিরসন এবং প্রবাসী কর্মীদের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করার আগেই এক কোটি দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর লক্ষ্য কি কেবল একটি উচ্চাভিলাষী ঘোষণা, নাকি এর পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট সময়সীমা, দেশভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ও পরিমাপযোগ্য বাস্তবায়ন কৌশল?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনে সরকারের এক কোটি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যের বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
