সেপ্টেম্বরে নবীকে নিয়ে কটূক্তি ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগে শ্রীলঙ্কান যুবককে মৃত্যুদণ্ড দেয় সৌদি আরবের আপিল আদালত
বিশেষ প্রতিবেদক। ঢাকা, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কার্যকরের খবর প্রকাশের প্রায় কাছাকাছি সময়েই সামনে এলো কিভাবে কূটনৈতিক দক্ষতায় শ্রীলঙ্কার সরকার সৌদিতে নবী অবমাননায় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত লংকান যুবকের সাজা বাতিল করলো। সমসাময়িক এই দুই ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে তাঁদের বিরুদ্ধে একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগের কথা বলা হলেও অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। আদালত তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর রাজকীয় আদেশে তা কার্যকর করা হয়।
জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের অবহিত করেনি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে বিষয়টি জানার পর কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে ঘটনার বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে।
এখানেই শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনোজন শিবারসার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগেই শ্রীলঙ্কা সরকার আইনি দল সৌদি আরবে পাঠায় এবং দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশি দুই নাগরিকের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, গ্রেফতার, বিচারকালীন সময়, মৃত্যুদণ্ডের রায় ও রায় কার্যকরের পুরো সময়টাতেই বাংলাদেশের কনস্যুলেট, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তারা পুরোপুরি বেখবর ছিলেন।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যাবার সংবাদ প্রকাশ্যে আসার পরে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ শুরু করে কনস্যুলেট।
শ্রীলঙ্কার উদ্যোগে কী ছিল, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী জানা যাচ্ছে?
শ্রীলঙ্কার নাগরিক অনোজন শিবারসা সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। চলতি বছরের জুনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে অনলাইনে ধর্মীয় বিতর্ক শুরু হয়। ভিডিওটিতে এক মুসলিম যুবককে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের পেছনে থাকা একটি কুকুরকে লাথি মারতে দেখা যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত অনলাইন আলোচনার একপর্যায়ে অনোজন তামিল ভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অনোজন পরে মন্তব্যটি মুছে ফেলেন এবং একটি ভিডিও বার্তায় ক্ষমা চান। তবে এর আগেই ওই মন্তব্যের স্ক্রিনশট তাঁর নিয়োগকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। জুলাই মাসে সৌদি পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

নবী অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার ২৭ বছর বয়সী অভিবাসী কর্মী অনোজন শিবারসা।
প্রথমে আল-আহসা ক্রিমিনাল কোর্ট তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ৩০ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে আপিল আদালত সেই সাজা পরিবর্তন করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এই রায় শ্রীলঙ্কায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ২৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে অনোজনের পরিবারের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনোজন শিবারসার ঘটনায় শ্রীলঙ্কা সরকারের উদ্যোগ ছিল বহুমুখী। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক যোগাযোগ চালায়, বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আইনি দল সৌদি আরবে পাঠানো হয় এবং সৌদি আইনজীবীদের সহযোগিতায় সর্বোচ্চ আদালতে আইনি প্রতিকার চাওয়া হয়। ১৩ অক্টোবর সৌদি সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে। শ্রীলঙ্কার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী অরুণ হেমচন্দ্র এই ফলের জন্য দুই দেশের সরকার, কূটনীতিক ও আইনি দলকে ধন্যবাদ জানান।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের কনস্যুলেটের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের জানানো হয়নি। এ বক্তব্য সত্য হলে তা গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে: দুই বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলা চলার সময় কনস্যুলেট কীভাবে মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছিল? তাঁদের আইনি কোন সহয়তা কি নিশ্চিত করা হয়েছিল কনস্যুলেট থেকে? মৃত্যুদণ্ডের রায় চূড়ান্ত হওয়ার আগে দণ্ড মওকুফ বা অন্য কোনো আইনি প্রতিকারের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছিল কি? অথবা কনস্যুলেট কি আদৌ জানতো প্রেমিকযুগলের গ্রেফতারের বিষয়ে?

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দুই বাংলাদেশির মরদেহ দ্রুত দেশে ফেরাতে সৌদির সহায়তা চাইলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। ১৩ই অক্টোবর, ২০২৬।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু অসমর্থিত সুত্রর তথ্য মতে বাসির ও সিতি দুজনে প্রণয়ে আবদ্ধ ছিলেন অনেকদিন থেকে। সৌদিতে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা যারা ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখেছেন, তারা জানান:
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বাসির আর সিতি-কে মসজিদে অন্তরঙ্গ ভাবে দেখা যায়, তারা একে অপরকে চুম্বনরত অবস্থায় ছিলেন, এর বেশী আর কিছুই ছিলো না ভিডিওটিতে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর ব্যাখ্যা চাওয়ার পরিবর্তে বিচারপ্রক্রিয়ার শুরু থেকেই সক্রিয় কনস্যুলার নজরদারি ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, দুটি ঘটনা তা সামনে এনেছে।
প্রবাসীদের জীবন রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়
বিদেশে কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মেনে বিচার পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার মতো নিজ দেশের সরকার অন্য দেশের আদালতের রায় সরাসরি বাতিল করতে পারে না। কিন্তু কূটনৈতিক যোগাযোগ, উপযুক্ত আইনজীবী নিয়োগে সহায়তা, আপিলের সুযোগ খোঁজা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ক্ষমা বা দণ্ড মওকুফের আবেদন করার মতো উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ সবক্ষেত্রেই থাকে।
২০১০ সালে মৃত্যুদন্ডের সাজাপ্রাপ্ত ৬ বাংলাদেশিকে “ব্লাডমানি” হিসাবে সৌদি সরকারকে প্রায় ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে ছাড়িয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা বাংলাদেশের সরকারের অসাধারণ কূটনৈতিক তৎপরতা আর দক্ষতার একটি উদাহারণ।
শ্রীলঙ্কার ঘটনা দেখিয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরও আইনি প্রতিকার ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর গুরুত্ব রয়েছে। তবে অনোজনের মৃত্যুদণ্ড বাতিল হওয়া মানেই তাঁর মুক্তি নিশ্চিত হয়েছে, এমন নয়; পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এখন প্রয়োজন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দুই নাগরিকের মামলা সম্পর্কে সরকারের কাছে কী তথ্য ছিল, কনস্যুলেট কী ধরনের সহায়তা দিয়েছিল এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সুযোগ অবশিষ্ট ছিল কি না, তা স্পষ্ট করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলাগুলো দ্রুত শনাক্ত ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
শ্রীলঙ্কা সরকার ও তার কূটনৈতিক মিশনের ধারাবাহিক আইনি প্রচেষ্টায় অনোজন শিবারসার মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়েছে। বিপরীতে, মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের প্রবাসী সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
