ভলকার টুর্কের দুই দিনের সফরে বাংলাদেশের প্রাপ্তি

ভলকার টুর্কের দুই দিনের সফরে বাংলাদেশের প্রাপ্তি
শেয়ার করুন

কূটনীতি ডেস্ক:

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক দুই দিনের সফরে সোমবার দিনগত রাতে (২৯শে অক্টোবর) দুজন সফরসঙ্গীসহ কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট নং- কিউআর-৬৩৮-এর মাধ্যমে জেনেভা থেকে দোহা হয়ে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক ও মুখপাত্র তৌফিক হাসান।

ভলকার টুর্কের সঙ্গে ছিলেন জাতিসংঘের মনাবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের পাব্লিক ইনফরমেশন অফিসার অ্যান্থনি এভারেট হেডলি এবং একই দপ্তরের মুখপাত্র রাভিনা কিশিন সামদাসানি।

হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক দুই দিনের ঢাকা সফরে বিভিন্ন উদ্যোগ, বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এই সফরে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন এবং দেশের বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার সংরক্ষণে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

প্রথম দিন: সরকারের উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক

২৯শে অক্টোবর ঢাকায় এসে প্রথম দিন ভলকার টুর্ক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকগুলোতে তিনি বাংলাদেশের আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে তাদের সাথে মতবিনিময় করেন।

সেদিন সকালে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সাথে বৈঠকের পরে টুর্ক সাংবাদিকদের জানান, তার আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য ছিলো আইনের শাসন ও মানবাধিকার।

তিনি বলেন, “মানবাধিকার ও আইনের শাসন পরস্পরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সরকার যে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, সেখানে মানবাধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

এই আলোচনায় তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড রায়ের বিষয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগও তুলে ধরেন।

আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জাতিসংঘ পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে এবং বিচার বিভাগকে স্বাধীন করা এবং মৃত্যুদণ্ড রহিত করার ওপর জোর দিয়েছে।

যদিও মৃত্যুদণ্ড সরাসরি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি, “বর্তমান বাস্তবতায় মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তন সম্ভব নয় কারণ এটি দণ্ডবিধিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন নিয়ে হাইকমিশনারের সাথে আলোচনা হয়েছে এবং তারা আইনি অধিকার সংরক্ষণের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

মানবাধিকার ও পুলিশ সংস্কার নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা

আইন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সাথে আলাপ করেন হাইকমিশনার টুর্ক। এই বৈঠকে টুর্ক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে কথা বলেন।

তিনি বলেন, পুলিশের সংস্কার কর্মসূচি এমনভাবে নেওয়া উচিত যেন সাধারণ মানুষ ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।

এসময় টুর্ক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেই সাথে পরামর্শ দেন, মিশনে যেসব সদস্য পাঠানো হয়, তাদের যেন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়।

রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশের কথা উল্লেখ করে এসময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণে আমরা চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছি।

তথ্যানুসন্ধান মিশন এবং তদন্তের অগ্রগতি

জুলাই-আগস্ট সংঘটিত নৃশংসতার তদন্তে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দল কাজ করে যাচ্ছে। ভলকার টুর্ক জানান, ডিসেম্বরে এই মিশনের তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

৩০শে অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন হাইকমিশনার টুর্ক। এই সাক্ষাতে তিনি ঢাকায় তার অন্যান্য বৈঠক সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেন এবং জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দলের অগ্রগতির কথা জানান।

ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং বিপ্লবের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত সম্পর্কেও আলাপ করেন ভলকার টুর্ক। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। এছাড়াও, তিনি গুমের ঘটনাগুলো নিয়ে বিশেষ তদন্ত কমিশনের সাথে আলোচনার বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তুলে ধরেন এবং বলেন, “অনেক কিছু ঠিক করা দরকার,” এই প্রসঙ্গে তিনি সরকারের সাথে সহযোগিতা করবেন বলে জানান।

ড. ইউনূস জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের প্রধানকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ এই সফরে খুশি এবং কৃতজ্ঞ।”

তিনি উল্লেখ করেন, তার সরকার মানবাধিকার সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আগের সরকারের ভুল পুনরাবৃত্তি করবেন না।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা

ড. ইউনূস ও ভলকার টুর্ক মিয়ানমারে সাম্প্রতিক সহিংসতার ফলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় নিয়ে বিশেষ আলোচনা করেন। টুর্ক জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আরও সমর্থন চান এবং রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের উপর যে বোঝা পড়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগে আনার আহ্বান জানান।

ঢাকায় মানবাধিকার দপ্তর খোলার বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য

এর আগে ২৯শে অক্টোবর রাজধানীর একটি হোটেলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজসভার পর সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ সাংবাদিকদের জানান, ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় হবে। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার ও তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।

ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার সম্মতি দিয়েছে উল্লেখ করে শারমিন মুরশিদ বলেন, ‘শিগগিরই এই কার্যালয় হবে। এখানে মানবাধিকার কার্যালয় থাকা মানে মানবাধিকারের জায়গা থেকে আমাদের শক্তি বাড়ল।’

কিন্তু ৩০শে অক্টোবর দুপুরে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন নিশ্চিত করেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর খোলার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “এখনো আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি।”

হাইকমিশনার টুর্কের সাথে ৩০শে অক্টোবর সকালে তার দপ্তরে বৈঠক করেন এবং এই বিষয়ে আলোচনা করেন।

এর আগে গণমাধ্যমে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর খোলার বিষয়ে নানা সংবাদ প্রকাশিত হয়, কিন্তু তৌহিদ হোসেন বলেন, “এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে দপ্তরটি খোলার ব্যাপারে সরকারের আপত্তি নেই।”

সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ

ভলকার টুর্কের এই সফর বাংলাদেশে মানবাধিকার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তার প্রতিটি বৈঠকেই বাংলাদেশে মানবাধিকারের উন্নয়ন এবং আইন ও বিচার বিভাগের সংস্কারে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ পায়।

টুর্ক বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের দপ্তর ঢাকায় স্থাপন করে তাদের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে চান তিনি।

এই সফরে তার বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে, জাতিসংঘ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বাংলাদেশের সরকারও এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ করতে আগ্রহী।

ভলকার টুর্কের সফর এবং তার কর্মসূচি বাংলাদেশের আইনের শাসন, মানবাধিকার ও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

Visited 70 times, 1 visit(s) today