দেশের গর্বের প্রতীক নারী ফুটবলারদের সাথে কেন এমন বৈষম্য?

দেশের গর্বের প্রতীক নারী ফুটবলারদের সাথে কেন এমন বৈষম্য?
শেয়ার করুন

স্পোর্টস ডেস্ক:

বাংলাদেশের নারী ফুটবলের গর্ব ঋতুপর্ণা চাকমা। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা খেলোয়াড় হিসেবে পুরস্কার হিসেবে পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক পেয়ে তিনি এক অকপট উত্তর দিলেন, যা বাংলাদেশের নারী ফুটবলারের জীবন সংগ্রামের বাস্তবতা প্রকাশ করে।

এক ভিডিওতে দেখা যায়, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঋতুপর্ণা বললেন, “পুরস্কারের টাকায় টিমমেটদের খাওয়াবো, আর বাকিটা দিয়ে মায়ের জন্য কিছু কিনবো।” এই সরল কথাগুলো শুনে একদিকে যেমন তার সরলতা মুগ্ধ করেছে জাতিকে, তেমনই মনে প্রশ্ন তুলেছে, কেন এই সামান্য কিছু টাকা তার কাছে এত বড় অর্থ বহন করে?

বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের বেতন কাঠামো একেবারেই নিম্নস্তরের। শীর্ষ A+ ক্যাটাগরির খেলোয়াড়রা মাসে পান মাত্র ১০ হাজার টাকা, A ক্যাটাগরিতে ৮ হাজার টাকা এবং B ক্যাটাগরিতে ৬ হাজার টাকা। এই অর্থে কি তাদের জীবন-যাপন সম্ভব?

তাদের প্রায় সবাই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা, অধিকাংশই পার্বত্য এলাকার। এই সামান্য অর্থ দিয়ে তারা তাদের পরিবারকে সহায়তা করার চেষ্টা করেন। অনেকের ঘরবাড়িও সুরক্ষিত নয়— বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি দুচালা ঘর, যেখানে বর্ষাকালে পানি পড়ে, আর মাটির মেঝে স্যাঁতসেঁতে হয়ে থাকে।

গতবছর সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আলোচনায় উঠে এসেছিল সেরা গোলকিপার রুপনা চাকমার জরাজীর্ণ ঘরের কথা। বলা হয়েছিল, তাদের থাকার জন্য ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হবে, বোনাস বাড়ানো হবে, কিন্তু কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি।

অন্যদিকে, এই নামমাত্র বেতনও তারা সময়মতো পান না। প্রায় ২-৩ মাস ধরে তাদের বেতন বকেয়া। কয়েকজন খেলোয়াড়ের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায় যে, তারা এই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে ভয় পান।

বাফুফের এক কর্মকর্তার ভাষ্যে জানা যায়, পূর্ববর্তী দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার কারণে এবং দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির জন্য বেতন বকেয়া রয়েছে এবং এটি শীঘ্রই সমাধান হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন ‘বৈষম্যবিরোধী’ বাংলাদেশে এই সফল ফুটবলারদের সাথে এত বৈষম্য? শুধুমাত্র নারী এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর বলে? নাকি অন্য কোনো কারণ?

একদিকে খেলোয়াড়রা মাসে ৮-১০ হাজার টাকা বেতন পেতে সমস্যায় পড়ছে, অন্যদিকে বাফুফে তাদের নির্বাচন আয়োজনের জন্য ৫০ লাখ টাকা খরচ করেছে। নির্বাচনী সভা ও কাউন্সিলরদের ফাইভ স্টার হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করতে ১১ লাখ টাকা খরচ করতেও কোনো সমস্যা হয়নি। এই বৈপরীত্য ফুটে উঠে বাফুফের ব্যবস্থাপনার অসামঞ্জস্য।

এতকিছু সত্ত্বেও, আমাদের নারী ফুটবলাররা ভারত, পাকিস্তান এবং নেপালের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে সাফ শিরোপা জিতেছেন, দেশকে গর্বিত করেছেন। দেশে ফিরে ছাদখোলা বাসে গণসংবর্ধনা পেলেও তাদের জীবনের এই অর্থনৈতিক সংকট দূর হয়নি। তাদের জয় শুধুই আমাদের গর্বিত করে, কিন্তু তাদের পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ দেখা যায় না।

এমন সংকট সত্ত্বেও ঋতুপর্ণারা তাদের প্রতিভা ও দক্ষতার মাধ্যমে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনেন। কিন্তু বাফুফের কাছে তাদের ন্যায্য অর্থ এবং জীবন-যাপনের নিরাপত্তা দাবি করা উচিত। খেলাধুলার উন্নয়ন এবং খেলোয়াড়দের সার্বিক সমর্থন না থাকলে ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রতিভাবান নারী খেলোয়াড় এই পেশা বেছে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে।

সত্যিকার অর্থে, দেশের নারী ফুটবল উন্নয়নের জন্য বাফুফেকে এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু গৌরবের মুহূর্তে সংবর্ধনা দিয়ে তাদের জীবনের সংগ্রামকে উপেক্ষা করলে এটি দেশের খেলাধুলার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হবে। তাই খেলোয়াড়দের সঠিক বেতন এবং সুরক্ষা দিতে সরকার ও বাফুফের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের জীবনের এই দুঃখজনক বাস্তবতা তুলে ধরে শুধুই গর্ব নয়, তাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে দেশের প্রতি তাঁদের অবদানের প্রকৃত মূল্যায়ন।

Visited 8 times, 1 visit(s) today