নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর কারওয়ানবাজার ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের একাধিক এলাকায় ফুটপাত, খোলা জায়গা ও অস্থায়ী দোকান দখল নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা। সরেজমিনে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—স্থানীয় পর্যায়ে জায়গা দখলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা। আর সেই দখলকৃত জায়গা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
গত কয়েক দিনে কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও রেলগেট, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন সড়ক এবং আশপাশের বাজার এলাকায় অন্তত ৩৫ জন ব্যবসায়ী, শ্রমিক, দোকানদার ও স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন নিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিস্তারিত অভিযোগ করেছেন।
‘জামায়াত জায়গা দেয়, বিএনপি টাকা তোলে’
কারওয়ানবাজারের সবজি আড়তের পাশের একটি অস্থায়ী দোকানে মৌসুমী ফলের ব্যবসা করছেন আব্দুল কাদের। বিডি ডাইজেস্টকে তিনি বলেন, জায়গাটা আমরা কিনি নাই। জামায়াতের লোকজন বলছে—এখানে বসতে পারবা, সমস্যা হবে না। বসার পর থেকেই বিএনপির লোকজন আসা শুরু করে। কখনো নিরাপত্তা, কখনো লাইন, কখনো রাজনৈতিক অনুদানের নাম করে টাকা নেয়।
তিনি বলেন, জামায়াত সমার্থক আমার এক আত্নীয়র মাধ্যমে দলটির ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পরে তারা বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এরপর আমি খুশি হয়ে তাদের দলীয় ফান্ডে ৫০ হাজার টাকা খুশি হয়ে বায়তুল মাল দিয়েছি।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের একটি চায়ের দোকানের কর্মচারী জানান, প্রথমে শিবিরের দুই ভাই এসে বলছে—এই জায়গা ফাঁকা আছে, বসতে পারো। কোনো ভাড়া লাগবে না। কিন্তু নির্বাচনের আগে আমাদের দলকে সামান্য সহযোগিতা করতে হবে কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই বিএনপির স্থানীয় নেতা এসে মাসিক চাঁদা ঠিক করে দেয়।
প্রতিদিনই চাঁদা, নামে ভিন্নতা
সবজি ব্যবসায়ী আমির হোসেন বলেন, প্রতিদিনই টাকা দিতে হয়। কোনো দিন দলীয় সাহায্য, কোনো দিন এলাকার নিরাপত্তা, কোনো দিন আবার বলে কর্মসূচি আছে। টাকা না দিলে দোকান উঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।
আরেক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, জামায়াতের লোকজন জায়গা দেখিয়ে দেয়, দখলটা পাকাপোক্ত করে। এরপর বিএনপির লোকজন নিয়মিত আসে টাকা তুলতে। দুই পক্ষের মধ্যে একটা বোঝাপড়া আছে বলেই মনে হয়।
বিএনপির নাম বারবার আসছে কেন?
তেজগাঁও এলাকার পরিবহন শ্রমিক নেতা আব্দুল মালেক বলেন, চাঁদাবাজির ঘটনায় বিএনপির নাম বেশি আসছে কারণ টাকা তোলার কাজটা তারাই সামনে থেকে করছে। মাঠে যে আসে, যে টাকা নেয়—সে বিএনপির পরিচয় দেয়।
এক স্থানীয় দোকানদার বলেন, পুলিশ এলে জামায়াত–শিবিরের লোকজন সামনে থাকে না। কিন্তু চাঁদা তোলার সময় বিএনপির লোকজনই দৃশ্যমান থাকে। তাই অভিযোগও ওদের বিরুদ্ধেই বেশি যাচ্ছে।
ভয়ের সংস্কৃতি ও নীরবতা
স্থানীয় এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, আমরা কেউ মুখ খুলতে চাই না। কারণ আজ না হলে কাল ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। সবাই জানে কে কোথায় যায়, কে কাকে টাকা দেয়।
একজন হকার বলেন, জায়গা ছাড়লে অন্য কোথাও বসার সুযোগ নাই। তাই চাঁদা দিয়েই থাকতে হয়।
রাজনৈতিক প্রভাবেই দখল টিকে আছে—অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও পারস্পরিক সমঝোতার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এই দখল ও চাঁদাবাজির চক্র টিকে আছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
কারওয়ানবাজার এলাকার স্থায়ী ব্যবসায়ী বলেন, সবাই সব জানে। কিন্তু রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থাকায় কেউ কিছু করতে পারে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিছু ব্যক্তি দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করলে দল তার দায় নেবে না। তবে সব অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় এক কর্মী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা কাউকে জায়গা দখল করে দিই না। আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
এলাকাবাসীর মতে, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও নিরপেক্ষ অভিযান না থাকলে কারওয়ানবাজার–তেজগাঁও এলাকার দখল ও চাঁদাবাজির এই চক্র ভাঙা কঠিন হবে।
