বিশেষ প্রতিবেদক
রাষ্ট্র ক্ষমতায় নেই আওয়ামী লীগ, আদালতে বাতিল হয়েছে তারেক রহমানের সব সাজা- তবুও কেন তিনি দেশে ফিরছেন না, এই প্রশ্ন বিএনপির ভেতরেও ঘুরছে অনেক দিন ধরে। নেতাকর্মীরা যেন নিজেদেরই আশ্বস্ত করছিলেন, ‘সময় হলেই ফিরবেন’, ‘নভেম্বর ইজ কলিং, তারেক রহমান কামিং’বলে বলে।
তবে ফেরার পথ রয়ে গেছে অনিশ্চিত।
অবশেষে সেই অনিশ্চয়তার কথা নিজেই জানালেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বললেন, দেশে ফেরা তার একার সিদ্ধান্ত নয়, ‘প্রতিবন্ধকতা’ আছে। তবে সেই প্রতিবন্ধকতার উৎস তিনি প্রকাশ করেননি।
তারেকের এই বক্তব্যের ঠিক আগে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় নেতৃত্ব নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলেন।
তারেক রহমান খোলসা না করলেও তার একদিন আগে শেখ হাসিনার ছেলে জয় বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশ বড় দুটি দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে একটি অগণতান্ত্রিক তৎপরতা রয়েছে, দুই দলেরই নেতৃত্ব পরিবর্তনে বিদেশ থেকে একটা ‘খেলা’ চলছে।
এর মধ্য দিয়ে একটি বার্তা শেখ হাসিনা পুত্র দিয়েছেন যে, আওয়ামী লীগ নিয়ে যে দেশি-বিদেশি ‘খেলা’ চলছে সেখানে তিনি চুপচাপ বসে থাকবেন না বরং এটির মোকাবিলা করবেন।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য কোনো বাধা নেই বলে জানানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলম লিখেছেন, তারেকের দেশে ফেরায় সরকারের কোনো আপত্তি নেই।
কিন্তু অভ্যন্তরীণ নাকি বহিরাগত— কোন শক্তি তারেকের ফেরায় বাধা দিচ্ছে, এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ সেনাবাহিনীর ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করছেন।
২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দল থেকেই দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেনা-সমর্থিত সেই ব্যবস্থায় তারেক রহমানও গ্রেপ্তার হন। নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরে সমঝোতার ভিত্তিতে বিদেশে যান তিনি। এরপর থেকে আর দেশে ফেরেননি।
দীর্ঘ সময় তিনি দেশের বাইরে থাকলেও আওয়ামী লীগ আমলে তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় সাজা হয়; ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায় হয় যাবজ্জীবন। ফলে দেশে ফিরলে তাকে জেলে যেতে হতো। কিন্তু জুলাই-আগস্টের দাঙ্গা-সহিংসতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সব সাজা বাতিল হয় উচ্চ আদালতে। তবুও তারেক দেশে ফেরেননি।
মা খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও তারেক ফিরবেন কি না, সে নিয়ে জল্পনা বাড়ে। কিন্তু শনিবার এক ফেসবুক পোস্টে এবার এনিয়ে মুখ খুললেন তারেক রহমান নিজেই; জানালেন, শঙ্কার কারণ আছে।
তবে তিনি বললেন, তার ফেরাটি তার ইচ্ছাধীন নয়। কিন্তু কার ইচ্ছাধীন, তার জবাব দিলেন না তিনি। স্পর্শকাতর বিষয় বলে এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু তার এই বক্তব্য সবার মনে কৌতূহল তৈরি করেছে, তারেক রহমানের ভয়টা আসলে কোথায়?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, আপত্তি দেশের বাইরে থেকেই আসছে।
তিনি বলেন, উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া নথিতে তারেক সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির বিষয় উঠে এসেছিল। ভারতের উদ্বেগও ছিল অতীতে। ফলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন না হলে তারেকের ফেরায় ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
মহিউদ্দিন আরও বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় ‘মাইনাস টু’–এর সঙ্গে ‘মাইনাস ফোর’–এর কথাও চলছিল—দুই পরিবারের ধারাবাহিক রাজনীতিকে বন্ধ করার চাপ ছিল। বর্তমানে শেখ হাসিনা পরিবার রাজনীতি থেকে ছিটকে গেছে, খালেদা জিয়া অসুস্থ, ফলে বাকি থাকছেন তারেক রহমান। তিনি দেশে ফিরবেন কি না, সেই অনিশ্চয়তা সেই পুরনো ফর্মুলার কথাই নতুন করে সামনে আনছে।
অবস্থাটা এখন এমন যে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালে তবেই দেশে ফেরার পথ খুলবে—তারেক রহমান নিজের পোস্টে সেই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। আর বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ থেকে বোঝা যাচ্ছে, নেতৃত্ব নির্বাচনের ‘খেলা’ এখনও চলছে, আর সেই খেলার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক পরিবারের ভবিষ্যৎ।
