❐ বিশেষ প্রতিবেদক
বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত গ্রেনেড হামলায় দেশি-বিদেশি পাচঁটি জঙ্গি সংগঠন সম্পৃক্ত ছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সিনিয়র অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান আদালতে এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বলেন, ওই নৃশংস হামলায় দেশি-বিদেশি ৫টি জঙ্গি সংগঠন যুক্ত। সংগঠনগুলো হচ্ছে- হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ, কাশ্মিরী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হিজবুল মুজাহিদীন, তেহরিক জিহাদ-ই ইসলাম, লস্কর-ই-তৈয়বা এবং মিয়ানমার আরাকানের সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)।
তিনি বলেন, এসব জঙ্গি সংগঠনসহ পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা-আইএসআই, তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ভয়াবহ নৃশংস ও বর্বরোচিত ২১শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলায় সম্পৃক্ত ছিল। তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিজিএফআই, এনএসআই ও বাংলাদেশ পুলিশকে ওই ঘটনা বাস্তবায়নে ব্যবহার করেছে।
সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, জড়িত থাকার দোষ স্বীকার করে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ১২ জন আসামী ১৩টি জবানবন্দি পেশ করেছেন। আসামীদের মধ্যে জঙ্গি মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সি দুটি জবানবন্দি পেশ করেন। তার জবানবন্দির অংশ বিশেষ তুলে ধরেন তিনি।
মুফতি হান্নানের সেই জবানবন্দিতে স্পষ্ট হয়েছে- ওই হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনকে হত্যা করা। এ ঘটনার পরিকল্পনা ও বাস্তাবায়নে অনুষ্ঠিত বৈঠক এবং জড়িতদের নাম তার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। এখানে বিএনপি নেতা সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তারেক রহমানসহ কারা কারা সম্পৃক্ত মুফতি হান্নান জবানবন্দিতে তার উল্লেখ করেছেন।
প্রধান কোসুঁলি বলেন, আসামীর জবানবন্দিকে সমর্থন করে রাষ্ট্রপক্ষের আটজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন- মেজর জেনারেল সাদিক হাসান রুমি, মেজর (অব.) আতিকুর রহমান, মাওলানা মোসাদ্দেক, আবদুল আজিজ সরকার, মেজর (অব.) সৈয়দ মুনিরুল ইসলাম।
সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ৫১১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এর মধ্যে অভিযোগপত্রে ৪০৮ জন, সম্পূরক অভিযোগপত্রে ৮৩ জন এবং রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে আরো ২০ জনকে সাক্ষী করা হয়। স্পর্শকাতর ও আলোচিত এ মামলায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) সিআইডির জ্যেষ্ঠ বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দসহ ২২৫ জনের সাক্ষ্য দিয়েছেন।
আসামীপক্ষ সাক্ষীদের জেরা করেছে। এরপর সকল আসামীকে ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা হয়। আসামীপক্ষে ২০ জন সাফাই সাক্ষ্য দেয়। রাষ্ট্রপক্ষ এসব সাক্ষ্য জেরা করেছে। আসামীপক্ষের কোন কোন সাক্ষ্যকে জেরায় তাদের বিরুদ্ধে গিয়েছে বলে দাবি করেন সৈয়দ রেজাউর রহমান।
তিনি বলেন, ২১শে আগষ্টে হতাহতের ঘটনায় আনা মামলা মহানগর দায়রা জজ আদালত ২০১১ সালের ২৫শে আগষ্ট এবং বিষ্ফোরক দ্রব্য আইনে আনা মামলা মহানগর ষ্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ আমলে নেয় ২০১১ সালের ১৪ই জুলাই।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ২১শে আগষ্টের ওই নৃশংস হামলায় পৃথক দুটি মামলায় মোট আসামী ৫২ জন। মামলার আসামী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে রয়েছে। এ মামলায় পুলিশের সাবেক আইজি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদাবক্স চৌধুরী, লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক এবং মামলার সাবেক তিন তদন্ত কর্মকর্তা-সিআইডির সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সিআইডির সাবেক এএসপি আতিকুর রহমান ও আবদুর রশিদসহ মোট ৮ জন জামিনে রয়েছে।
তারেক রহমান, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মেজর জেনারেল (এলপিআর) এটিএম আমিন, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারসহ ১৮ জন পলাতক। এছাড়া ৩ জন আসামী জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুফতি হান্নান ও শরীফ সাইদুল আলম বিপুলের অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগের এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত ও নেতকর্মী-আইনজীবী-সাংবাদিকসহ পাঁচ শতাধিক লোক আহত হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পত্নী আইভি রহমান। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হামলা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের প্রচন্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাবৃন্দও এই গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।
