নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ১১ই আগস্ট, ২০২৫।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুসের প্রেস উইং চীনের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রচারণায় ব্যস্ত থাকলেও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি চীন সরকারের খরচে ২৩ সদস্যের একটি বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল, উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে, চীনের কুনমিং সফর করে। এই সফরের পর থেকে চীনের হাসপাতাল ও চিকিৎসা সুবিধার ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয়েছে, যা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
৬ থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং একাধিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। শনিবারের একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চীনের কুনমিং টংরেন হাসপাতাল মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেন লিং জানান, সম্প্রতি এক বাংলাদেশি পরিবার তাদের কিশোর পুত্রের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালে এসেছিল। রোগীর বাবা এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে এবং অন্য দেশে ব্যয় বেশি হওয়ায় তিনি চীনে আসেন। এখানে সাশ্রয়ী খরচে চিকিৎসা পেয়েছেন এবং হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসা প্রক্রিয়া বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। শেন লিং আরও জানান, হাসপাতালে মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও দোভাষী সেবা রয়েছে।
এই প্রচারণা নিয়ে তরুণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী নাভিদ মুস্তাক বলেন, “চীনের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে প্রচারণার দায়িত্ব প্রেস উইংয়ের নয়। কোন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কেমন, তা প্রচার করা চিকিৎসক বা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাজ।” তিনি মনে করেন, চীন বা পাকিস্তানের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো হতে পারে, কিন্তু এ বিষয়ে সরকারি প্রচারণা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমাতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, “সরকারের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান থেকে বিদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রশংসা করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া পেশাদারিত্বের পরিপন্থী। এটি স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমায়।”
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের প্রচারণা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি পণ্য বা খাবারের প্রচারণায় জড়িয়ে পড়তে পারে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুরুজ্জামান খান খসরু বলেন, “ইদানীং বাংলাদেশের মানুষের ভারতমুখী চিকিৎসা প্রবণতা কমিয়ে চীনের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটি দেশের স্বার্থবিরোধী।”
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের উচিত দেশের মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা।
দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি উদাসীনতা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের উচিত গত এক বছরে স্বাস্থ্যখাতে কী কী উন্নয়ন করা হয়েছে তা তুলে ধরা। পরিবর্তে, বিদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রচারণা দেশের স্বাস্থ্যখাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমাচ্ছে। ডা. নুরুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে দেশের টাকা দেশেই থাকে এবং মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে।” তিনি সরকারের কাছে অবিলম্বে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দাবি জানান।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস উইংয়ের চীনের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রচারণা দেশের স্বাস্থ্যখাতের প্রতি উদাসীনতার প্রমাণ। এটি জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে এবং দেশের চিকিৎসাপ্রার্থীদের বিদেশের উপর নির্ভরশীল করে তুলছে। সরকারের উচিত দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া এবং জনগণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা।
