নিজস্ব প্রতিবেদক
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে সরকারি কর্মকর্তাদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানোকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই নির্দেশনা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ তার প্রেস উইং এবং উপদেষ্টাদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা করলে সেটা দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবেন। যদিও প্রধান উপদেষ্টার অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজ এবং প্রেস উয়িং সহ উপদেষ্টাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেইজে “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষের পূর্বের প্রচারোনা এখনও দেখা যাচ্ছে।
অথচ সরকারের “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে প্রচারণাকে চ্যালেঞ্জ করা হাইকোর্টের রিট পিটিশন নম্বর ১২০১/২০২৬-এর নাকচ হয়েছে। হাইকোর্টের রায় আর নির্বাচন কমিশনের সিন্ধান্তের পরস্পরবিরোধী অবস্থান শাসন ও বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রিট পিটিশন ১২০১/২০২৬-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল এটি নিশ্চিত করা যে, সরকার গণভোটে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের (বিশেষ করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের) পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারবে না এবং এমন প্রচারণা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আবেদনকারীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, এটি নির্বাচনী নিরপেক্ষতা লঙ্ঘন করে। কিন্তু হাইকোর্ট এই রিট নাকচ করে দিয়েছে। শুনানিতে রাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, নির্বাচন কমিশন, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির আইনজীবীরা কোর্টে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সরকার অবশ্যই গণভোটে জনসচেতনতা বাড়াতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রচারণাও চালাতে পারে। কেউ কেউ লন্ডন বা কানাডার গণভোটের উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, সরকারের এমন ভূমিকা অস্বাভাবিক নয়।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুসারে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট বিষয়ে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন। কিন্তু তারা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে ভোট প্রদানের জন্য কোনোভাবে আহ্বান জানাতে পারবেন না। এমন কার্যক্রম গণভোটের ফলাফল প্রভাবিত করতে পারে বলে এটিকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ইসির এই অবস্থানের সঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের এই দ্বিমুখীতা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ রিট আবেদন যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল—সরকারের ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা নিষিদ্ধ করা—তা হাইকোর্ট নাকচ করার পরে ইসি হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচারনাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, হাইকোর্ট কি ইউনূস সরকারের প্রভাবে আইন বহির্ভূত রায় দিয়েছে? বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা তীব্র হচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে আইনের ব্যত্যয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের গায়ের জোরে প্রভাব বিস্তার বলে দেখছেন। অন্যরা মনে করছেন, গণভোটে সংস্কারের পক্ষে জনমত গঠনে সরকারের ভূমিকা থাকা উচিত।
তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসির নির্দেশনা স্পষ্ট হলেও তার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে গণভোটের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
