নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই শিশু হাসপাতালে বিএনপিপন্থি ৬৫ চিকিৎসক নিয়োগ, জামায়াতপন্থিদের প্রতিবাদ

নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই শিশু হাসপাতালে বিএনপিপন্থি ৬৫ চিকিৎসক নিয়োগ, জামায়াতপন্থিদের প্রতিবাদ
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সম্প্রতি ৬৫ চিকিৎসককে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে গোপনে, বিধি বহির্ভূতভাবে, জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই। নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই বিএনপি-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাব-এর সদস্য বলে জানা গেছে। এতে বঞ্চিত হয়েছেন মেধাবী চিকিৎসকরা। এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতপন্থি চিকিৎসকরা।

এই অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রথম থেকেই ছিল গোপনীয়তা ও পক্ষপাতের ছাপ। ১লা জুন কেবল হাসপাতালের নোটিশ বোর্ডে একটি বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হয়, যাতে মাত্র ৪২টি শূন্য পদে নিয়োগের কথা বলা হয়। অথচ শেষ পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয় ৬৫ জনকে। আবেদনকারী প্রায় সবাই ছিলেন হাসপাতালের ভেতরের প্রশিক্ষণার্থী বা অধ্যয়নরত চিকিৎসক। ঢাকার বাইরে বা অন্য হাসপাতালের চিকিৎসকদের এই নিয়োগ সম্পর্কে জানার সুযোগই দেওয়া হয়নি।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক এবং পরিচালনা বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হক- দুজনই ড্যাব-এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মাহবুবুল হক বর্তমানে ড্যাবের সক্রিয় সদস্য, আর আজিজুল হক সংগঠনটির সাবেক সভাপতি। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় একতরফাভাবে এই নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।

ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ড্যাবের বিলুপ্ত কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ডা. এম এ কামাল নিজেই স্বীকার করছেন যে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা সবাই ড্যাবের সদস্য। এতে প্রতীয়মান হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

অথচ নিয়ম অনুযায়ী, এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষাসহ স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তা এড়িয়ে গিয়ে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় পরিচয়ে নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। বঞ্চিত করা হয়েছে অন্যদের।

এই অনিয়মের বিরোধিতা করে জামায়াতপন্থি চিকিৎসক সংগঠন এনডিএফ ইতিমধ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, সারা দেশের চিকিৎসকদের তথ্য না দিয়ে, গোপনে অযোগ্যভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা ছিল না, ছিল শুধু রাজনৈতিক পক্ষপাত।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ২রা জুলাই হাসপাতালের পরিচালকের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়। এরপর ১০ই জুলাই তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা আজ রোববার হাসপাতাল পরিদর্শনে যাবেন বলে জানা গেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম বলেন, নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আমরা তদন্ত করছি। প্রতিবেদন পেলে বোঝা যাবে সব ঠিকঠাক হয়েছে কি না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অন্যতম একটি জাতীয় হাসপাতাল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কবলে পড়েছে। ড্যাবের মতো বিএনপি-ঘনিষ্ঠ সংগঠনের চাপে এমন স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে চিকিৎসা খাতের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ন্যূনতম নিয়মনীতি মানা হয়নি। এতে প্রশ্ন উঠেছে হাসপাতালটির নিরপেক্ষতা ও দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়েও।

এ ধরনের দলীয় প্রভাব, পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ এবং গোপন প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবার মান এবং জনআস্থা—দুটোই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অতীতে এরকম অনিয়ম হয়নি বলেও জানান তারা।

Visited 5 times, 1 visit(s) today