ইতিহাস থেকে বর্তমানে ফিরল মঙ্গা! চরম দুর্দশায় খেটে খাওয়া মানুষ

ইতিহাস থেকে বর্তমানে ফিরল মঙ্গা! চরম দুর্দশায় খেটে খাওয়া মানুষ
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন:

রংপুর অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব, খাদ্য সংকট, এবং অর্থনৈতিক মন্দা জনগণের জীবনে চরম দুর্দশা ডেকে এনেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক বন্যার কারণে দুর্বিষহ অবস্থায় পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষরা। এই সময়ে কাজের অভাবে দিন কাটাতে হচ্ছে চরম অর্ধাহারে-অনাহারে। কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট এবং সরকারি সহায়তার ঘাটতিতে তাদের দুর্দশা আরও বেড়েছে।

শংকরদহ চরের বাসিন্দা আলাউদ্দিন জানান, এই সময়ে আমাদের চরম কষ্ট। কাজ নেই, খাদ্যের সংকট তীব্র। আমরা ঠিকমতো বেঁচে থাকার জন্যই লড়ছি।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এলাকার শ্রমজীবী মানুষজন কাজের খোঁজে রাজধানী বা অন্যান্য জেলায় যেতে ভয় পাচ্ছেন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে। ফলে গ্রামে কোনো কাজ না পেয়ে শহরের হাট-বাজারে ভিড় করছেন অনেকেই, কিন্তু কাজের সুযোগও সেখানে খুবই কম।

প্রতিদিন রংপুর শহরের শ্রমিকের হাট শিমুলবাগসহ বিভিন্ন স্থানে কৃষি শ্রমিকরা সকাল থেকে কাজের আশায় অপেক্ষা করেন। গঙ্গাচড়ার ছালাপাক চরের আবু বকর বলেন, প্রতিদিন সকালে আল্লাহর নামে বাড়ি থেকে বের হই। কিন্তু কাজ জোটে না। সন্তানদের খাওয়ানোই দায় হয়ে পড়েছে।

এমন অবস্থায় অধিকাংশ দিন তার মত অসংখ্য অসহায় মানুষ দিনশেষে খালি হাতে বাড়ি ফেরেন। বিশেষ করে তিস্তার চরে বাস করা মানুষজনের অবস্থা আরও শোচনীয়। এই এলাকার অনেকের বাড়িঘর নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এখন তাদের সামান্য আয় দিয়েও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

শংকরদহ চরের সিরাজুল ইসলাম বলেন, কাজ না জুটলে খালি পেটে দিন কাটে। ঘরে খাবার নেই, কাজের সুযোগও নেই।

গঙ্গাচড়ার বয়স্কভাতাভোগী অশীতিপর ননীবালা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, আগে সরকার আমাদের খোঁজ খবর নিত, মাসে মাসে ভাতার টাকা পেতাম, উপকার হইত। এখন কেউ খোঁজ নেয়না, টাকাও আসেনা। সবাই বলতেছে আর টাকা আসবেনা। এখন আমরা দুইটা মানুষ কীভাবে চলব ভগবান জানেন।

বয়স্ক ভাতা ছাড়াও প্রতিবন্ধী স্বামীর জন্যও সহায়তা পেতো এই পরিবারটি। বর্তমানে প্রতিবেশিদের কাছে চেয়েচিন্তে কোনোমতে টিকে আছেন।

৫ই আগস্ট ক্ষমতর পট পরিবর্তনের পর সরকারের সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টানীর অধীনে থাকা কোটি কোটি মানুষের ভাগ্যে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কর্মসৃজন কর্মসূচির আওতায় থাকা জনগোষ্ঠীর হাতে সহায়তা পৌঁছাচ্ছে না। তাছাড়া জনপ্রতিনিধি না থাকায় এবং বিবিধ রাজনৈতিক কারণে এসব কর্মসূচি বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। যার ফলে চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষজন।

গঙ্গাচড়া উপজেলার ইউএনও নাহিদ তামান্না বলেন, অতিদরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচির বরাদ্দ এখনও আসেনি। আমরা আশা করছি বরাদ্দ দ্রুত আসবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রংপুরের এই চরম দারিদ্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতেই হবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও উন্নয়ন গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, এ অঞ্চলের মানুষকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের মাধ্যমে কাজের সুযোগ না দিলে দারিদ্র্য কমানো সম্ভব হবে না। দেশের অর্থনীতিতে এই অঞ্চলের অবদান বাড়াতে তাদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

কর্মসংস্থানের এই চরম সংকট এবং বেকারত্বের কারণে রংপুর অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত সংকটময় হয়ে উঠেছে। মন্দা কাটিয়ে উঠে স্বাভাবিক জীবন যাপনের প্রত্যাশায় দিন গুনছে মানুষ, কিন্তু অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি।

Visited 449 times, 1 visit(s) today