চালের বাজারে আগুন, সরকারি মজুদে ঘাটতি, ঝুঁকিতে খাদ্য নিরাপত্তা

চালের বাজারে আগুন, সরকারি মজুদে ঘাটতি, ঝুঁকিতে খাদ্য নিরাপত্তা
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন:

দেশের বাজারে চালের দাম লাগাতার বৃদ্ধি জনজীবনে চরম সংকট তৈরি করেছে। অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি এবং উৎপাদন কম হওয়ায় আগামী দিনে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। উৎপাদনে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮ লাখ ৩৯ হাজার টন।

ইতোমধ্যে চালের দাম গত বছরের তুলনায় ৭ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক মাসেই বেড়েছে ২ শতাংশ পর্যন্ত। যা সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) মতে, চালের মজুত বৃদ্ধি ও দাম স্থিতিশীল রাখতে আমদানির শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করা এখন জরুরি। তবুও, বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ- টিসিবির হিসাবে, বাজারে এখন মোটা চালের কেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা। মাঝারি চাল ৫৮-৬৩ টাকা। সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৮০ টাকা কেজি। এক সপ্তাহে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২ থেকে ৮ টাকা। সরু চালের সর্বনিম্ন দর ৮ টাকা বেড়ে ৭২ টাকা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে টিসিবি। গত ৮ই আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মোটা চালের সর্বনিম্ন দাম কেজিতে ২ টাকা, মাঝারি চাল ৪ টাকা এবং সরু চালের দাম ১২ টাকা বেড়েছে।

চাল সরকারের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ যায় চালের পেছনে। চালের দাম এমন সময় বাড়ছে, যখন ভোজ্যতেল, চিনি, সবজি, ডিম, মুরগির মাংসসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম চড়া।

বাদামতলী এলাকার চাল ব্যবসায়ী ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, বাজারে ধানের দামের ওপর নির্ভর করেই মিল মালিকেরা চালের দাম বাড়াচ্ছেন। আমনের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমরা দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি না। বাজারে মোটা চালের দাম প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫৮-৬৩ টাকা এবং সরু চাল ৭২ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

দেশে কোনো মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হলে চালের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে হাওরে আগাম বন্যায় বোরো মৌসুমের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখন এক সপ্তাহে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৭ থেকে ৯ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

সরকারি মজুতে ঘাটতি, আমদানির প্রয়োজনীয়তা

খাদ্য অধিদপ্তরও বলছে, গুদামে এখন চালের মজুত ১০ লাখ টনের নিচে নেমেছে, যা গত ১৫ই আগস্ট ছিল প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টন। সরকারিভাবে বিতরণ বাড়ানোয় মজুত কমছে। যে হারে চাল বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে, তাতে আগামী বছরের জুলাই নাগাদ প্রয়োজনের তুলনায় ১১ লাখ টন চালের ঘাটতি হতে পারে। নিরাপত্তা মজুত ও সম্ভাব্য ঘাটতি বিবেচনায় ১০ লাখ টন চাল আমদানি করা দরকার। বেসরকারি খাতকেও চাল আমদানি বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।

খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আমন মৌসুমে চালের উৎপাদন কম হওয়ায় মজুত সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা মন্ত্রণালয়কে মজুত বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।

বিটিটিসির মতে, বিশ্ববাজার থেকে চাল আমদানিতে খরচ বেড়ে যাওয়ায় শুল্ক-কর তুলে নেওয়া অত্যাবশ্যক। থাইল্যান্ড ও ভারতের চাল আমদানি করলে খরচ প্রতি কেজিতে ৭৫ থেকে ৯৫ টাকা পর্যন্ত দাঁড়াবে। তাই, খরচ কমাতে এবং বাজারে চালের সরবরাহ বাড়াতে আমদানির ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা উচিত বলে জানিয়েছে কমিশন।

সংকট উত্তরণে করণীয়

বিশেষজ্ঞরা চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে সরকারকে দরিদ্র মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে চাল সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে। পরবর্তী বোরো মৌসুমে ধানের আবাদ বাড়াতে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

এদিকে, বর্তমান পরিস্থিতিতে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত সরকারি পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। অন্যথায়, চালের দামে ক্রমাগত বৃদ্ধি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সংকট আরও বাড়াবে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Visited 32 times, 1 visit(s) today