ইনডেমনিটির ঘোষণায় বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় নির্যাতিতরা

ইনডেমনিটির ঘোষণায় বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় নির্যাতিতরা
শেয়ার করুন

সংবাদ প্রতিবেদন:

গত ৫ই আগস্ট রাষ্ট্র ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর পঞ্চগড়ে আহমদিয়া মুসলিম জামাত সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংস হামলা হয়েছে। এতে হতাহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। যাদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সি কিশোর শাহরিয়ারের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার বাবা ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা করছেন।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকারের এক সিদ্ধান্তের ফলে তার মনে এমন শঙ্কার জন্ম নিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১৪ই অক্টোবর দায়মুক্তি দেওয়া বিবৃতিতে বলেছে, ১৫ই জুলাই থেকে ৮ই আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের পক্ষে ছিল যারা, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হবে না।

তবে আন্দোলন যাদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ইত্যাদি সবই চলমান রয়েছে। এমনকি আওয়ামীপন্থীদের ওপর প্রাণঘাতি হামলা, হত্যা, নির্যাতনসহ যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার ন্যায়বিচার বঞ্চিত হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা, এমন অভিযোগ রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলাও নেওয়া হয়নি। কারণ, মামলা বা অভিযোগ করতে থানায় গেলে উল্টো তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমন শংকা থেকে কেউ ওমুখো হচ্ছেন না বলে জানা গেছে।

পঞ্চগড়ের আহমদিয়া সম্প্রদায়ের একজন সম্মানিত সদস্য মাওলানা মুহাম্মদ সালাউদ্দিন জানান, পাঁচ শতাধিক মানুষ লাঠি ও হাতুড়ি নিয়ে আহমদিয়াদের বাড়িঘরে হামলা চালায়।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, টানা দুই-তিন ঘণ্টা ধরে নৈরাজ্য চলতে থাকে। অনেকে মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন, বাকিরা ঝোপঝাড়ে বা প্রতিবেশীর বাড়িতে লুকিয়েছিলেন।

হামলায় আহত ১৬ বছর বয়সী কিশোর শাহরিয়ারের বাবা আব্দুল জানান, ৫ই আগস্ট হামলাকারীরা তার ১৬ বছর বয়সি ছেলের মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। এরপর থেকে সে ঢাকার এক হাসপাতালে কোমায় আছে।

এএফপিকে অসহায় এই পিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে এখনও চোখ মেলেনি বা কথাও বলেনি।

তার ওপরেও হামলা হতে পারে কিংবা কেউ হয়রানি করতে পারে, এই আশঙ্কার কারণে তিনি তার পুরো নাম জানাননি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বিবৃতির কারণে আব্দুলের মনে শঙ্কা জেগেছে যে, তার ছেলের উপর হামলার জন্য দায়ীদের আর বিচার হবে না। ন্যায়বিচারের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

হামলা ও সহিংসতা

গত ৫ই আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর সারাদেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। সারাদেশে ৫ শতাধিক থানায় হামলা করা হয়েছে। অসহায় পুলিশ সদস্যরা বেঘোরে প্রাণ হারান। আওয়ামীপন্থীদেরৱ ওপর নেমে এসেছিল ভয়াবহ বিপর্যয়। তাদের মধ্যে যাকে পাওয়া গেছে, তাদের হত্যা করা হয়েছে, কাউকে না পেলে বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে। এমনকি কাজের লোক বা কর্মচারীরাও রেহাই পায়নি। আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়েছে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। অন্তত ১০ হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী নিহতের দাবি করেছে সমর্থকরা।

পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের ৪৬ জন সদস্যের মৃত্যুর কথা বলা হচ্ছে। যদিও পুলিশের কয়েকটি সূত্রের দাবি, ৩ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য শহিদ হয়েছেন।

ধর্মীয় ঘৃণা ও লোভ থেকেও কিছু সহিংসতা হয়েছে। সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়িঘরে-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর হয়েছে। হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কয়েকশ হিন্দু। তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর এমনকি মূল্যবান সামগ্রীও লুটপাট হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব বলছে, ৫ থেকে ৮ই আগস্টের মধ্যে শিশুসহ অন্তত ৩১৮ জন মারা গেছেন। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বলছে, ৪ থেকে ২০শে আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণ ও হত্যাসহ ২,০১০টি ঘটনা ঘটেছে।

গত ৫ই আগস্ট ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের সময় হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুকুমার বিশ্বাস নামের এক মুচি জানান, তিনি ঐ ভবনের সামনে ‘চারটি পোড়া দেহ’ দেখেছেন। আকারে ছোট হওয়ায় ‘এর মধ্যে তিনটি শিশুর দেহ’ ছিল বলে মনে করছেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হিন্দু সম্প্রদায়ের এক নারী জানান, ৫ই আগস্ট তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এসময় তার স্বামী তাদের তিন সন্তান নিয়ে লুকিয়ে ছিলেন বলেও জানান তিনি। ‘‘আমরা ভয়ে বিচার চাইনি,” বলে জানান ঐ নারী।

সচেতন মহলের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নির্মল রোজারিও বলেন, ‘‘প্রতিটি ঘটনার বিচার হতে হবে। ‘‘সরকার যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে তাদের উচিত প্রতিটি মামলার তদন্ত করা এবং অপরাধীদের বিচার করা।”

মানবাধিকার কর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘সহিংসতার অপরাধে জড়িত কাউকে মুক্তি দিতে’ দায়মুক্তির আদেশ ব্যবহার না করা গুরুত্বপূর্ণ।” এ বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সারা হোসেন বলেন, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হামলা কিংবা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের কোনোটিই ‘বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না’।

Visited 27 times, 1 visit(s) today