বিশেষ প্রতিবেদক:
কোটা আন্দোলনের নামে জুলাই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মহাপরিকল্পনা (ড. ইউনূসের ভাষ্যে- মেটিক্যুলাসলি ডিজাইনড থিং) বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতে গত গত ৫ই আগস্টের পর রাষ্ট্রক্ষমতার যে পট পরিবর্তন, তাকে এর কুশীলবরা নতুন স্বাধীনতা আখ্যা দিচ্ছেন। রিসেট বাটনের মাধ্যমে একাত্তরের স্বাধীনতার ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধকে ধামাচাপা দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।
এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার প্রথম বলি হলো স্কুলে ভর্তির জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল এবং একইসাথে চব্বিশের তথাকথিত স্বাধীনতা আনতে গিয়ে হতাহত হয়েছেন যেসব শিক্ষার্থী, তাদের আজীবন বেতন মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, একাত্তরের মহান মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণকারী অসহায় দুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত ছিল ৫ শতাংশ কোটা। স্কুলের প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির এই কোটা বাতিল করল ড. ইউনূসের অন্তবর্তীকালীন সরকার।
এতদিন অন্য সব শিক্ষার্থীর মত প্রতিযোগীতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় বা প্রযোজ্য প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পর উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত তালিকায় উঠে আসার পরবর্তী পর্যায়ে গিয়ে ভর্তির সুযোগ পেতে কোটা সুবিধা প্রয়োগ করতে পারতেন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানরা। অর্থাৎ মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় কোটা সুবিধা প্রযোজ্য ছিল না। কোটা সুবিধা ব্যবহার করা যেত মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়ার পর। কিন্তু এবার সেই সুযোগটাও বাতিল করল ইউনূস সরকার।
স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীনের দপ্তর-সংস্থাগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ১ শতাংশ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ১০ শতাংশ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা ২ শতাংশ, অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর যমজ ও সহদোর ভাই-বোন ৫ শতাংশ কোটায় সংরক্ষিত আসনে ভর্তির সুযোগ পাবে।
আগামী বছর থেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কেউ আবেদন ও ভর্তির সুযোগ থাকছে না। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে জারি করা ভর্তি নীতিমালায় এ সংশোধনী আনা হয়েছে। তবে নীতিমালায় বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হলে কোটা সুবিধা পাবে। অর্থাৎ নাতি-নাতনিদের বেলায় প্রযোজ্য না হলেও সন্তানদের বেলায় প্রযোজ্য থাকছে।
নীতিমালার এই অংশটি নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, এর মাধ্যমে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ‘মশকরা’ করা হয়েছে, সম্মানহানি করা হচ্ছে। কোটা বাতিল করলে বাতিল করুক, কিন্তু সন্তানদের জন্য কোটা রেখে কেন এই মশকরা? জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমানে যে বয়স, তাদের বেশিরভাগের সন্তানদেরই চাকরির বয়স নেই, সেখানে সন্তানদের স্কুলে ভর্তির কোটা রাখাটা হাস্যকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সম্মানহানির জন্য করা হয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা বা শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা এবং পুত্র-কন্যা পাওয়া না গেলে নাতি-নাতনিদের ভর্তির জন্য ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত রাখার নিয়ম ছিল এতদিন পর্যন্ত। তবে নতুন নীতিমালায় বীর মুক্তিযোদ্ধা বা শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যার ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকবে। সেই কোটায় না পাওয়া গেলে ‘মেধাতালিকা’ থেকে ভর্তি করতে হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমিক শাখা-২-এর শিক্ষা অফিসার জি. এম. মোস্তাফিজুর বলেন, প্রাথমিকে সাধারণত ৬ থেকে ১৩ বছরের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়। এবার ভর্তির ক্ষেত্রে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনি কোটা থাকছে না। তবে তাদের পুত্র-কন্যার কোটা থাকবে। যদিও এ ক্ষেত্রে এমন বয়সী সন্তান আছে বলে জানা নেই।
অন্যদিকে জুলাই-আগস্টে আহত শিক্ষার্থীদের বেতন বা টিউশন ফি মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তাদের শিক্ষা জীবনের বর্তমান পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কোনো ফি আর দিতে হবে না।
আজ মঙ্গলবার (২৯শে অক্টোবর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফি মওকুফের জন্য কোন প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে, তাও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, আহত মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের (সব সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি ও বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষার্থীদের বেতন বা টিউশন ফি মওকুফের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আহত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের বর্তমান পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন বা টিউশন ফি মওকুফের-এ সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে। সংশ্লিষ্ট সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আহত শিক্ষার্থীরা বেতন মওকুফের বিষয়ে নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রসহ আবেদন করবেন।
এদিকে এসব নিয়ে শুরু হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা। যে আন্দোলনকে বৈষম্যবিরোধী বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, বৈষম্য দূর করতে কোটা বাতিলের দাবি করা হয়েছিল, সেই আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলতে গিয়ে এখন নানা অবয়বে কোটাপ্রথা চালু হচ্ছে। একদিকে যেমন একটি ছাত্র সংগঠনের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করতে ধরে ধরে পুলিশে দেওয়া হচ্ছে কোনো সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই, অন্যদিকে আরেকটি পক্ষকে অতিরিক্ত সুবিধা দিতে তাদের পড়াশোনার ফ্রি করে দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রের অনুকূলে।
এতে কি বৈষম্য দূর হচ্ছে নাকি কোনো একটি পক্ষকে খুশি করতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, প্রশ্ন করছেন নেটিজেনরা।
