এলপিজির কৃত্রিম সংকট ঘটিয়ে প্রতিদিন ৩২শ কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে সিন্ডিকেট

এলপিজির কৃত্রিম সংকট ঘটিয়ে প্রতিদিন ৩২শ কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে সিন্ডিকেট
শেয়ার করুন

সংবাদ প্রতিবেদন

রান্নায় ব্যবহৃত এলপিজির কৃত্রিম সংকট ঘটানো হয়েছে সুকৌশলে। দোকানে গেলে বলা হচ্ছে গ্যাস নেই, অথচ ফোনে কিংবা আড়ালে বাড়তি টাকায় মিলছে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার। দেশজুড়ে ৪ কোটি গ্রাহকের নিত্যপ্রয়োজনীয় এই জ্বালানিকে ঘিরে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে—সেই চিত্রই উঠে এসেছে এই অনুসন্ধানে।

ঢাকা, টঙ্গী, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় খুচরা গ্যাসের দোকানগুলোতে একই দৃশ্য। সারি সারি খালি সিলিন্ডার সাজানো, কিন্তু বিক্রেতার দাবি—গ্যাস নেই।

এক দোকানদার বললেন, “গ্যাস নাই। কাস্টমার আইসা বারবার বিরক্ত করে, তাই দোকান বন্ধ রাখছি।”

কিন্তু প্রতিবেদক দোকান ত্যাগ করার কিছুক্ষণ পরই দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। ফোনে যোগাযোগ করলেই আসে আশ্বাস—গ্যাস পাওয়া যাবে, তবে দাম দ্বিগুণ। কোথাও ২২০০ টাকা, কোথাও ২৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য, যা নির্ধারিত দামের অনেক বেশি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খুচরা ব্যবসায়ী স্বীকার করেন, “আমার কাছে নাই। তবে ট্রাই করলে পাওয়া যেতে পারে। সকালে একজন আইনা দিছিলাম—২৫০০ টাকায় বিক্রি করছি।”

এই ‘সংকটের’ বাস্তবতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে গেলে বেরিয়ে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। টঙ্গীর নতুন বাজার এলাকার একটি সরবরাহকারী গোডাউনে দেখা যায়—ভর্তি গ্যাস সিলিন্ডার, প্রকাশ্যেই চলছে বেচাকেনা। কিন্তু মাত্র ৫ মিনিট পর একটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা দেখেই দৃশ্যপট বদলে যায়। হুড়োহুড়ি করে সিলিন্ডার সরিয়ে ফেলা হয়, গোডাউনের দরজায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তালা।

কৌশলে ভেতরে ঢুকে দেখা যায়—সারি সারি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার। তখন আর সংকটের কোনো চিহ্ন নেই।

সংকটের প্রশ্নে সরবরাহকারীদের নতুন ব্যাখ্যা—ড্যামারেজ। এক সরবরাহকারী বলেন, “আমাদের একটা গাড়ি গেলে ১০–১২ দিন বসা থাকে। ড্যামারেজ দিতে হয়। কিছুদিন আগে চার বা পাঁচ তারিখে একটা গাড়ির জন্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা ড্যামারেজ দিতে হয়েছে।”

এই অজুহাতেই বাড়তি দামের দায় চাপানো হচ্ছে ভোক্তার ওপর।

লুটপাটের অঙ্ক কত?

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটি এলপিজি গ্রাহক রয়েছে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে একজন খুচরা ব্যবসায়ীর লাভ মাত্র ৫০ টাকা। সে হিসাবে প্রতিদিন ২০০ সিলিন্ডার বিক্রি করলে দৈনিক লাভ হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা।

কিন্তু কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একই সিলিন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা অতিরিক্ত লাভে। এতে একজন বিক্রেতার দৈনিক আয় দাঁড়ায় দেড় থেকে ২ লাখ টাকা। এই হিসাব সারাদেশে প্রয়োগ করলে ভোক্তাদের পকেট কেটে লুটপাটের অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৩২শ কোটি টাকা।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলছে, এটি কোনো স্বাভাবিক সংকট নয়। এর পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

ভোক্তা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “সুযোগটা নিয়েছে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী। দেখা যাচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় মজুদ রয়েছে। যারা বেশি টাকা দিচ্ছে, তারাই পাচ্ছে। সরবরাহ আর কৃত্রিম সংকট—সবকিছু মিলিয়ে একটি চক্র কাজ করছে।”

আমদানির পরও সংকট কেন?

পিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়। তখন কোনো সংকট দেখা যায়নি। পরের মাসে আমদানি আরও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু ঠিক তখন থেকেই বাজারে শুরু হয় সংকটের নাটক।

প্রশ্ন উঠছে—গ্যাস তাহলে গেল কোথায়?

সংকটের অজুহাতে দোকানে গ্যাস নেই, অথচ ফোনে ফোনে যোগাযোগ করলেই পাওয়া যাচ্ছে—এটাই এখন সিলিন্ডার গ্যাসের অলিখিত নিয়ম। বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এই চক্র ভাঙতে না পারলে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ঘিরে এই লুটপাট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Visited 15 times, 1 visit(s) today