❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
ভারতের কলকাতায় বাংলাদেশি উপদূতাবাসের প্রথম সচিব (প্রেস) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে তারিক চয়নের মন যেন কিছুতেই বসছে না কর্মক্ষেত্রে। গত ২০০ দিনের মধ্যে ৬২ দিন তিনি অবস্থান করেছেন দেশে। মাসে একাধিকবার তার দেশে যাতায়াত ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। একজন কূটনীতিক দায়িত্ব ফেলে কেন ঘন ঘন দেশে যাচ্ছেন-আসছেন, তা নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে খোদ উপদূতাবাসেই।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ বছরের জুন মাসের ২০ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত তিনি ৬২ দিন দেশে থেকেছেন। এর মধ্যে শুধু একবার আকাশপথ ব্যবহার করেছেন। বাকি সময় নজিরবিহীনভাবে স্থলবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন। এজন্য কলকাতা থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর পর্যন্ত এক দফা এবং বন্দর পেরিয়ে ঢাকা পর্যন্ত আরেক দফা গাড়ি ভাড়া করে আসা-যাওয়া করেন তিনি।
আর্থিকভাবে এভাবে যাতায়াত আকাশপথের চেয়ে ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হলেও রহস্যজনক কারণে তারিক এ পথ ব্যবহার করেন।
স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা যায়, প্রতিবার দেশে প্রবেশের সময় তিনি একাধিক বড় লাগেজ সঙ্গে নিয়ে আসেন। আবার সেই লাগেজ বদলেছেন। তার কর্মকাণ্ডে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
এমনও অভিযোগ উঠেছে, তিনি কূটনৈতিক রক্ষাকবচের আড়ালে বে-আইনি পণ্য পাচারে জড়িয়ে পড়েছেন।
সূত্র জানায়, গত ২০ থেকে ২৪শে জুন ৫ দিন নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে দেশে কাটান তারিক চয়ন। জুলাইতে দেশে আসেন ২ বার। ৪ থেকে ৬ই জুলাই ৩ দিন ও ২৪ থেকে ২৭শে জুলাই ৪ দিন কাটান। আগস্টের ১৫ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত দেশে কাটান ৬ দিন। পরের মাসে ৫ থেকে ৭ই সেপ্টেম্বর ৩ দিন দেশে কাটান। ১৮ থেকে ২৬শে অক্টোবর মোট ৯ দিন তিনি দেশে ছিলেন।
ছুটি শেষে ২৭শে অক্টোবর কলকাতায় গিয়ে যোগদানের কথা থাকলেও আরো ৭ দিন কাটিয়ে দেন দেশে। ঠিক সে মাসেই ১৫ থেকে ১৭ই নভেম্বর আবার ৩ দিনের জন্য দেশে ফেরেন তারিক চয়ন। ডিসেম্বরে দুই দফায় ৫ দিন দেশে কাটান।
এর মধ্যে রহস্যজনকভাবে ৩১শে ডিসেম্বর গিয়ে আবার সেদিনই ফেরেন কলকাতায়। জানুয়ারি মাসে এরই মধ্যে ৭ দিন দেশে কাটিয়ে গেছেন তিনি।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তারিক চয়নকে নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও তার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায় না সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে।
সম্প্রতি তারিক চয়ন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে নিয়ে একটি বইও প্রকাশ করেছেন এবং নিজেকে বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে জাহির করছেন। ফলে তার দাপটে উপদূতাবাসের সবাই অস্থির।
সূত্র জানায়, এই স্বল্প সময়ে ৬২ দিন দেশে কাটালেও একদিনের জন্যও তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাননি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে সাংবাদিক তারিক চয়নকে নিয়োগ দেয়ার পর গত বছরের নভেম্বরে প্রথম সচিব (প্রেস) হিসেবে তার চাকরির মেয়াদ আরও এক বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে ইতিমধ্যে।
সাংবাদিক মহলে তারিক চয়ন এক সন্দেহজনক চরিত্র
তারিক চয়নের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। এই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ড. ইউনূস গংয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও শেখ হাসিনা বিরোধী প্রোপাগাণ্ডা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ঢাকায় সাংবাদিক মহলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর পেইড এজেন্ট হিসেবেও সন্দেহ করা হয় তাকে। শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই দাঙ্গায় ছিলেন সর্বোচ্চ সক্রিয়দের একজন। পুরস্কার হিসেবে নিজে নিয়োগ পেয়েছেন দূতাবাসে।
কলকাতায় তারিকের পদায়নের পেছনে গোপন মিশন রয়েছে বলে সন্দেহ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লার দেবিদ্বারে জন্ম তারিক চয়নের পরিবার স্থানীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং পাকিপ্রেমী হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের পরিবার। তারিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে গুপ্ত সংগঠন শিবিরের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই উগ্রবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী গণমাধ্যমে কাজ করেন তিনি। সাংবাদিকতা পেশা হলেও গত কয়েক বছর ধরে শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রীতিমত জিহাদি ভূমিকায় নামেন তিনি। দেশি- বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অপতথ্য ও প্রোপাগাণ্ডা ছড়ান। জুলাই দাঙ্গার সময় দেশে-বিদেশে শেখ হাসিনা সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন করার গুরুদায়িত্ব পালন করেন।
ভারত, হিন্দু এবং আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী খ্যাত তারিককে কলকাতায় পাঠানোর পেছনে ইউনূস সরকারের গোপন অভিসন্ধি থাকতে পারে বলে মনে করেন দেশের প্রবীণ সাংবাদিকরা। বিশেষত, আওয়ামী লীগ সরকারের যেসকল মন্ত্রী-সাংসদ-আমলা-পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণভয়ে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি চালাতেই তিনি কাজ করছেন বলে সন্দেহ।
