সাইফুন্নেছা ইলমী
১৫ জুলাই থেকে নিজেদের উপর সাইবার বুলিং শুরু…
১৬ জুলাই: সকাল সকাল টিএসসি যাওয়ার কথা থাকলেও, আমি নিজের মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলাম—কী করব, কী করব না। রুমে আমি আর একজন সিনিয়র আপু ছিলাম। আপুকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম কী করা উচিত। হলের নিচে থমথমে অবস্থা। পরিচিত মানুষজনের অলরেডি অন্য রূপ দেখছি। সকালে এক ফ্রেন্ডকে বলে রুমে কিছু শুকনা খাবার নিয়েছিলাম। দুপুরে ফ্রেশ হয়ে তাই খেলাম। একে ঠিক খাওয়া বলে, নাকি ক্ষুধা মেটানো—ঠিক বলতে পারছি না। দুপুরের দিকে পকেটে কিছু টাকা নিলাম। বের হব, দেখি মেইন গেইট ব্লক। লেইট গেইট দিয়ে বের হয়ে টিএসসি গেলাম। সাথে রুমের চাবি বা আর কিছু নেই। প্যান্ট পরে গেলাম, ভাবলাম তাহলে আর বাড়তি ব্যাগের ঝামেলা টানা লাগবে না।
টিএসসি গিয়ে অন্যান্য আপুদের সাথে বসেছিলাম। একবার বের হচ্ছি, আবার টিএসসি যাচ্ছি—এইরকম একটা অবস্থা। সবারই পেটে ক্ষুধা। রাতের খাবারের ব্যবস্থা টিএসসিতেই করা হয়েছে। সারাদিন কারও ঠিকঠাক খাওয়া নেই। রাত তখন ১০টা বাজে। সিলভি আপুকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী করবেন? হলে যাবেন, নাকি অন্য কোথাও?” হল আমার কাছে এই মুহূর্তে সেইফ (নিরাপদ) লাগছে না। উনি বললেন খালার বাসায় যাবেন। সাথে একজন জুনিয়র আছে। বললাম, “কাকার বাসা কাছেই, চলেন ওখানেই যাই।” যেহেতু জুনিয়র আছে, আমাদের আগে ওর সেইফটির কথা ভাবতে হবে। সব হল আস্তে আস্তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তার মধ্যেই শামসুন্নাহার হলের উনারা চলে গেছেন।
রোকেয়া হলের ১২ জন আর মৈত্রী হলের ১ জন (সারা আপু)—আমরা একসাথে। সারা আপুকে একা হলে যেতে দেওয়া রিস্ক, তাই আর দেওয়া হয়নি। আমি ইনান ভাইয়ের কাছে গেলাম কী করব জানতে—হলে যাব, নাকি কাকার বাসায় চলে যাব? উনি হলের সার্বিক পরিস্থিতি জানতে চাইলেন। বললাম। বলার পর বললেন, “আরেকটু অপেক্ষা কর।” কিছুক্ষণ পর বললেন, “হলে ঝামেলা মনে হলে যাওয়ার দরকার নেই।” তখন আতিকা আপুকে বললাম, “ইনান ভাই তো বললেন ঝামেলা হলে না যেতে।”
তখন আবার আতিকা আপু সাদ্দাম ভাইয়ের সাথে কথা বললেন। সিলভি আপু, বর্ণ আপু, রূপা আপু, অনামিকা আপু, সৈকত ভাইয়ের কাছে গেলেন। সামিহা আপু শয়ন ভাইয়ের কাছে গেলেন। মানে একটা গোলক ধাঁধা হয়ে গেল। তারপর সাদ্দাম ভাই প্রভোস্ট ম্যামকে কল দিলেন। তখন ম্যাম বললেন, “সমস্যা নেই, মেয়েদের পাঠাও, আমরা আছি।”
টিএসসি থেকে বের হয়ে আমরা ১৩ জন হলের দিকে যাচ্ছিলাম। রোকেয়া হলের সামনে যেতেই শামসুন্নাহার হল থেকে মেয়েদের স্লোগান ও চিল্লাচিল্লি শুরু হলো। নিজেদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছিল। আমরা ছিলাম—আতিকা আপু, সাফ্রিন সুরাইয়া আপু, ফাল্গুনি আপু, এ এস রূপা রাজ আপু, বর্ণালী ঘোষ বর্ণ আপু, সিলভি আপু, তাসফিয়া শাম্মি (সারা) আপু, সামিহা আপু, বিপর্ণা আপু, আয়েশা আশরাফ অনামিকা আপু, আমি, আর ৩ জন জুনিয়র (সঙ্গত কারণে নাম বলছি না)।
হলে খবর নিলাম সবাই সবার মতো আছে, বেশিরভাগই রুমে। ঝামেলা হওয়ার চান্স নেই। পরিচিত মানুষজনের মেসেজ—আমরা হলে গিয়ে ঝামেলা করব কি না! হায়রে সেলুকাস! বললাম, আমরা ঝামেলা করব কেন?
হলে সুনসান নীরবতা। লেইট গেইট দিয়ে ঢুকেই সেন্ট্রাল রিডিং রুমের এখানে দেখি কয়েকজন। কেউ কিছু বলেনি। তবে ওত পেতে ছিল আমাদের জন্যই। হাসান ভাইয়ের দোকান পার হয়ে জাস্ট চামেলি ভবনের এখানে আসলাম, দেখি ডিবেটিং ক্লাবের আর সাহিত্য সংসদের কয়েকজন আমাদের দেখে উঁকিঝুঁকি করছে। টিভি রুমে প্রায় ৩০ জন গোল হয়ে বসা। টিভি রুম পার হব ঠিক তখনই পেছন থেকে চিল্লাচিল্লি—”হলে ছাত্রলীগ ঢুকছে, সব আপুরা বের হোন।” মানে কী? আমরা কি তাদের সাথে ঝামেলা করতে গেলাম নাকি?
বিল্ডিংয়ের বারান্দা থেকে থালাবাসনের শব্দ, স্লোগান। ১০ মিনিটে হলের মাঠে মিনিমাম ৩০০ মেয়ে। প্রভোস্ট ম্যাম বের হয়ে আসলেন। আমরা হাউজ টিউটরদের অফিসে গেলাম। ম্যামরা আমাদের বললেন, “রুমে যাও।” ৭ মার্চের দিকে যত এগোচ্ছি, দেখি মেয়েদের সংখ্যা বাড়ছে। আমরা অবস্থা খারাপ দেখে সবাই একসাথে লিফটে উঠি। কারণ একসাথে থাকলে কিছুটা হলেও প্রতিরোধ করা যাবে। ১৩ জন বনাম পুরো রোকেয়া হল। গ্রুপে খবর দিলাম অবস্থা এইরকম। এর মধ্যেই সবাই ফোন দিয়ে আপডেট জানতে চাচ্ছে, এদিকে নেটওয়ার্ক খারাপ। আমরা গেলাম ১১০৬ নম্বর রুমে, ১১ তলায়। ওটা বর্ণ আপুর রুম।
রুম ভেতর দিয়ে লাগানোর পর টেবিল দুটো দরজার মুখে দিলাম। কারণ তারা আমাদের দিকে মিছিলসহ ছুটে আসছে টের পেলাম, রুমে তারা ঢুকবেই। টেবিল টেনে দিয়ে আবার বেড দুটোও টেনে দিলাম, যেন আমাদের পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লাগে। আশেপাশের রুমের লোকজন আমাদের দেখিয়ে দিল। এসেই রুমের জানালা ভাঙা শুরু, দরজা ভাঙার চেষ্টা! একপর্যায়ে দরজা ভেঙে রুমে ঢুকে গেল। ছোট্ট একটা বেলকনিতে ১৩ জন। এদিকে নেটওয়ার্ক সমস্যা, একসাথে অনেকজনের কল—সবার ফোনের অবস্থা খারাপ।
এর মধ্যেই অনেকের সাথে যোগাযোগ হলো। আমাদের বের হতে বলল। আমরা তাদের সাথে তখনও ঠান্ডা মাথায় কথা বলার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছি। জানালার গ্লাস ভাঙতেই বর্ণ আপুর হাত কেটে রক্ত পড়া শুরু হলো। এই দেখে নিজেদের কয়েকজনের আরও প্যানিক অ্যাটাক, কান্নাকাটি। এইভাবে প্রায় এক ঘণ্টা যাওয়ার পর ম্যামরা আসলেন, আমাদের বের হতে বললেন।
আমরা অনড়—প্রক্টরিয়াল টিম ছাড়া বের হব না। একসময় সিচুয়েশন এমন হলো যে, তারা ম্যামদের ওপরই অ্যাটাক করবে। তখন আমরা বের হয়ে লিফটে গেলাম। আমাদের লিফট ব্যবহার করতে দিল না। ১১ তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে গিয়ে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। তাদের একেকজনের হাতে লাঠি, রড, হাড়ি-পাতিল, বটি, হলুদ-মরিচের পানি—এইসবসহ আরও অনেক কিছু ছিল। মজার ব্যাপার হলো, রুম থেকে বের হয়ে দেখি সব পরিচিত মুখ। জুনিয়র-সিনিয়র সব পরিচিত মুখ।
বের হব, লেইট গেইটের দিকে যাচ্ছিলাম। তাদের কথা—আমরা যেন মেইন গেইট দিয়ে বের হই। মেইন গেইটের দিকে যাচ্ছি, তখন মরিচের পানি, হলুদের পানি ছিটা খেতে খেতে ৭ মার্চ থেকে বের হলাম। শরীরে অসম্ভব রকম জ্বালাপোড়া শুরু হলো। পেছন থেকে আর কী কী দিয়ে আঘাত করছে, সব কিছুই কেমন যেন অস্পষ্ট। তবুও মনে হচ্ছিল কিচ্ছুই লাগেনি, রোবট হয়ে গেছি। মেইন গেইটে যাওয়ার পর আমরা কয়েকজন গোল হয়ে দাঁড়ালাম—আমি, বিপর্ণা আপু, আর ৩টা জুনিয়র। তখনকার অবস্থার কথা মনে পড়লে এখন হাসি পায়। এলাকার যে জুনিয়রটাকে সবচেয়ে বেশি আদর করতাম, মনে হচ্ছিল ও আমাদের গিলে খাবে। যে জুনিয়রগুলো আমার রুমে ছিল একসময়, ওদের দেখে আমি স্তব্ধ।
পরে একজন ম্যাম গিয়ে আমাদের বললেন প্রভোস্ট বাংলোর দিকে যেতে। এই পথটুকু কীভাবে পার হয়েছি, এখনো ঠিকঠাক মনে করতে পারি না। গেইট পার হব, পেছন থেকে আঘাত। একটা জুনিয়র পড়ে গেছে। ওকে কয়েকজন ধরে তুললাম। এর মধ্যেই গিয়ে দেখি বর্ণ আপু, সামিহা আপু ম্যামের ওখানে। সবশেষে আমরা কয়েকজন বের হতে পারলাম। তখনও আটকে ছিলেন আতিকা আপু, সিলভি আপু, ফাল্গুনী আপু, সুরাইয়া আপু; আর আগে থেকে হলে ছিলেন সীঁথিমা আপু।
এদিকে নিজেদের অবস্থা খারাপ, অন্যদিকে উনারা ভেতরে। এর মধ্যেই প্রভোস্ট বাংলোর গেইট ভাঙা শুরু, দাদুদের ওপর আক্রমণ। তখন আমরা বাংলো থেকে বের হয়ে গেলাম। বাংলো থেকে বের হয়ে গেলাম লিলি আপুর (যুব মহিলা লীগের সেক্রেটারি) বাসায়। আমাদের সাথে ছিলেন রাকিব ভাই (সেন্ট্রালের ভাইস প্রেসিডেন্ট)। তখন ঠিক রাত কয়টা বাজে আমার জানা নেই। কারো জুতা নেই, কারো ব্যাগ নেই। আপুর বাসায় গিয়ে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না; আপুর কান্না দেখে আমিও কান্না শুরু করে দিলাম। তখনও বাকিরা বের হয়নি। নিজেদের মধ্যে উৎকণ্ঠা। শেষ রাতের দিকে খবর এলো বাকিরাও বের হতে পেরেছে। কিছুটা স্বস্তি।
চোখে ঘুম নেই, ফোনে চার্জ নেই। কোনোমতে চার্জে দিয়ে সবার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা। একে একে অন্যান্য হলের ভাঙচুরের খবর আসতে লাগল।
লেখক: সাইফুন্নেছা ইলমী
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, রোকেয়া হল ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
