নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ রহমান গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে।
বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তেজগাঁওয়ের তেজতুরি বাজার এলাকায় (স্টার কাবাবের গলি) অজ্ঞাতনামা অস্ত্রধারী একাধিক যুবক মুছাব্বিরকে কাছ থেকে গুলি করে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা সুফিয়ান বেপারি ওরফে মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন।
গুরুতর আহত অবস্থায় মুছাব্বিরকে বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত মাসুদ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনায় মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতনামা ৪–৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মুছাব্বির হত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, “মুছাব্বির হত্যার ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার। ঘটনাটি ঘটিয়েছে রহমান। তাকে পাচ্ছি না। তাকে পেলেই সব বেরিয়ে যাবে।”
রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সে কারওয়ানবাজার চাঁদাবাজি করে।”
বৃহস্পতিবার রাতে মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম বলেন, “আমার স্বামী রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক কোনো সমস্যার কথা আমাদের বলতেন না। তবে প্রায়শই তার প্রাণনাশের হুমকির কথা জানাতেন।’’
স্বামীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘উনি বলতেন, ‘আমার তো অনেক বেশি শত্রু হয়ে গেছে, হয় তো যে কোনো সময় আমাকে মেরে ফেলবে।’ এ ঘটনায় আমরা কাউকে সন্দেহ করছি না।”
কে এই ‘চাঁদাবাজ রহমান’
কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনায় এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বলে নিশ্চিত করেছে তদন্তকারী পুলিশের একাধিক দল।
গত সোমবার কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের সামনে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধনে অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ওই মানববন্ধনে হামলা চালানো হলে ব্যবসায়ীরা লাঠিসোটা নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে যায়।
এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া যায়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তেজগাঁও থানা যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্যসচিব আবদুর রহমানের অনুসারীরা দীর্ঘদিন ধরে কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজি ও দোকান দখলের সঙ্গে জড়িত। এসব অভিযোগের প্রতিবাদেই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছিল, যার জেরে হামলা চালানো হয়।
কারওয়ান বাজার ইসলামিয়া শান্তি সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক বেলায়েত হোসেন সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, কারওয়ান বাজার সুপারমার্কেট, কিচেন মার্কেট, ১ ও ২ নম্বর সুপারমার্কেটের ব্যবসায়ীরা আবদুর রহমান ও তার সহযোগীদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
দোকানভিত্তিক মাসিক ও দৈনিক হারে চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি বরফ বিক্রেতাদের কাছ থেকেও অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
চাঁদাবাজির অভিযোগে আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, যার মধ্যে রোববার তিনটি মামলা দায়ের করা হয় বলেও জানান তিনি।
বেলায়েত হোসেন আরও বলেন, আবদুর রহমান আগে তেজগাঁও থানা যুবদলের সদস্যসচিব ছিলেন, তবে চাঁদাবাজির অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন—এমন অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা।
তদন্তে যা উঠে এসেছে
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, তেজতুরি বাজার এলাকায় হত্যাকাণ্ডের পরপরই সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ শুরু করে পুলিশ। এরপর বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে সবজি ব্যবসায়ী মো. ফারুক হোসেনকে হেফাজতে নেয় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল।
তিনি মহানগর যুবদলের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সহসভাপতি। একই রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে মো. আব্দুল মজিদ মিলনকে হেফাজতে নেয় ডিবি। তিনি ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক।
এছাড়া মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা তেজগাঁও থানা পুলিশ আরও তিনজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, “মুছাব্বিরের স্ত্রী মামলা করতে এসে আমাদের বলেছেন বেশ কিছুদিন ধরেই তার স্বামী জীবননাশের হুমকি পাচ্ছিলেন। তবে এই ঘটনায় কোনো জিডি বা মামলা করেননি তিনি। ’’
‘‘আমরা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা দুজনকে গ্রেপ্তারে কাজ করছি। ঘটনাস্থল থেকে ৭.৬৫ বুলেটের তিনটি খোসা উদ্ধার করেছি। এছাড়া কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি, ফার্মগেটে গ্যারেজ দখল ও রাজনৈতিক কারণগুলো সামনে রেখে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করা হচ্ছে।”
পুলিশ জানিয়েছে, চাঁদাবাজি, দখল ও রাজনৈতিক বিরোধ—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ নেপথ্য উদ্ঘাটনে তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
