বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশে আইনজীবীদের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, বার অ্যাসোসিয়েশন ও আইন বিশেষজ্ঞদের একটি জোট। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সংগঠিত জনতার সহিংসতায় আইনজীবী অ্যাডভোকেট নাইম কিবরিয়া (৩৫) নিহত হওয়ার ঘটনায় তারা তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে।
আজ ৯ই জানুয়ারি, শুক্রবার ফ্রান্স, পোল্যান্ড, মিশর, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কাজাখস্তান ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞরা এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, পবনা জেলা জজ আদালতের আইনজীবী এবং আওয়ামী লীগপন্থি অ্যাডভোকেট নাইম কিবরিয়াকে ২০২৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর রাতে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ জনতা পিটিয়ে হত্যা করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন চাইতে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। ঘটনার সময় তিনি পূর্বাচলে তার এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন।
প্রত্যক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের বরাতে জানানো হয়, রাত আনুমানিক ১০টার দিকে একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত গাড়ির সামান্য সংঘর্ষের পর কয়েকজন উগ্রপন্থী ব্যক্তি তাকে গাড়ি থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মারধর করে। এ সময় তার গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। পরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
যৌথ বিবৃতিতে এই হত্যাকাণ্ডকে সংঘবদ্ধ জনতা কর্তৃক সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, এটি বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)-এর সরাসরি লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আইনজীবী নাইম কিবরিয়ার হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, হয়রানি ও ভয়ভীতির একটি ধারাবাহিক চিত্র এর মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। সরকারি নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতা দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ)-এর এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়, গত ১৪ মাসে সারাদেশে অন্তত ৮৪৯ জন আইনজীবী হত্যা, গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা ও হুমকির শিকার হয়েছেন। একই সময়ে সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতায় অন্তত ১৯৭ জন মানুষ নিহত হলেও এখনো কাউকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি।
যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সাত দফা দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—হত্যাকাণ্ডের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন, জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ ‘আইনজীবী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন।
এছাড়া জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি এ ঘটনাসহ বাংলাদেশে আইনজীবীদের ওপর হামলার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “অ্যাডভোকেট নাইম কিবরিয়ার জন্য ন্যায়বিচার শুধু একটি ব্যক্তিগত দাবি নয়; এটি বাংলাদেশের আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।”
