বিপুল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আহরণের বাস্তবতায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান

বিপুল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আহরণের বাস্তবতায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজস্ব আয় বাড়াতে এনবিআরের সংস্কার নিয়ে পরিকল্পনা জমা হচ্ছে, প্রকল্প বাড়ছে, কাগজে অগ্রগতির তালিকাও লম্বা হচ্ছে—কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব প্রবাহ একেবারে স্থবির। একের পর এক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ যোগ হলেও রাজস্ব অর্জনের গতি বাড়েনি। কাঠামো ও নীতির ভাষ্য যতই উচ্চকিত হোক, মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে—ফল আসছে না।

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসের তথ্যই তা স্পষ্ট করেছে। এনবিআর লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকার ঘাটতিতে রয়েছে, যা ১২.৬০ শতাংশ। আদায় হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা—লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭ কোটি। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি থাকলেও সেটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ব্যর্থতাকে ঢাকতে পারেনি।

ই-রিটার্ন, ই-টিআইএন, ই-অডিট, আইভিএএস, ই-ইনভয়েস—এসব প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পের কথা বছরের পর বছর বলা হচ্ছে। কাগজে এগুলো ‘ভবিষ্যৎ রাজস্ব প্রশাসনের ভিত্তি’ বলা হলেও বাস্তবে বেশির ভাগ উদ্যোগই মাঝপথে আটকে আছে; মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব সীমিত। প্রযুক্তি যোগ হচ্ছে, প্ল্যাটফর্ম বাড়ছে—কিন্তু কর আদায়ের মূল সমস্যাগুলো একই জায়গায় রয়ে গেছে। ফলে রাজস্ব প্রবাহের ধীরগতি কাটেনি।

তিনটি প্রধান খাত—ভ্যাট, আয়কর ও কাস্টমসে—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি। ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ৪৬ হাজার ৮৭৮ কোটি, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৪৮ হাজার ১৪৬ কোটি। আয়করে ঘাটতি আরও বড়—৯ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা, যা ১৯.৫৪ শতাংশ। কাস্টমসের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা বা ১৬.২৭ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যা প্রযুক্তির ঘাটতিতে নয়, বরং অর্থনীতির মন্থরতায় এবং করব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতায়।

অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনির মতে, অস্থিতিশীল অর্থনীতি, ব্যবসার ধীরগতি, আমদানি-রপ্তানির নিম্ন প্রবাহ—সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায়ের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করেছে।

কাস্টমসে শুল্ক আদায় কমছে, ভ্যাটে লিকেজ বাড়ছে, বিক্রি গোপনের প্রবণতা কমছে না। করজাল সংকীর্ণ, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর পৌঁছাতে পারছে না। কর প্রশাসনের দক্ষতার ঘাটতি—এই চক্র থেকে মুক্তি মিলছে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এনবিআরের ভেতরের অস্থিরতা। বদলি, সাজামূলক ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ চাপ কর্মকর্তাদের মনোযোগ ব্যাহত করেছে—প্রতিক্রিয়া পড়েছে মাঠপর্যায়ের সংগ্রহেও, মন্তব্য করেছেন সাবেক আমলা ফিরোজ মিয়া।

এনবিআরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি খাতেই ঘাটতি, প্রতিটি সূচকই বার্তা দিচ্ছে—লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান কমছে না।

এর মধ্যেও এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বছরের শেষ দিকে সংগ্রহ বাড়বে বলে আশাবাদী। করজাল সম্প্রসারণ, ফাঁকি রোধ, বকেয়া আদায় এগুলোই তাঁদের প্রধান ভরসা। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বাস্তব চ্যালেঞ্জ কঠিন— বাকি আট মাসে আদায় করতে হবে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা।

সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদের মতে, সমস্যার মূলেই রয়েছে অযৌক্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ।

তার ভাষায়, এনবিআরের সক্ষমতার বাইরে যে ঢাউস লক্ষ্য দেওয়া হয়—সমস্যার শুরু সেখানেই। বাস্তবতা বিবেচনা না করে লক্ষ্য বাড়ালে সংস্কার ও প্রযুক্তি দিয়েও রাজস্বপ্রবাহে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা সম্ভব নয়।

Visited 11 times, 1 visit(s) today