বিএনপি সরকারের উন্নয়ন: নোয়াখালীতে সাড়ে ৫ কোটি টাকার সেতু নির্মাণে রডের বদলে চিকন তার

বিএনপি সরকারের উন্নয়ন: নোয়াখালীতে সাড়ে ৫ কোটি টাকার সেতু নির্মাণে রডের বদলে চিকন তার
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে একে একে অনিয়ম, দুর্নীতি ও বড় মাপের ঘাপলার খবর উঠে আসছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে সড়ক, কালভার্ট, সেতু নির্মাণ, রডের পরিবর্তে বাঁশ বা চিকন তার, নিম্নমানের ইট, বালির ব্যবহারসহ আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ। এছাড়াও নিম্নমানের সামগ্রীর ব্যবহার যেন সাধারণের চোখে না পড়ে, সেজন্য দিনের বেলায় কাজ না করে গভীর রাতে তড়িঘড়ি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে বলেও উঠে এসেছে বিভিন্ন অনুসন্ধানে।


এরই ধারাবাহিকতায় এবার নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর কাজে অনিয়ম এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। নির্মাণকাজের বিভিন্ন অনিয়মের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

অভিযোগের পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ত্রুটিপূর্ণ কাজ ভেঙে নতুন করে সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে এবং দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এ ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল।

এলজিইডি নোয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট থেকে সাহেবেরহাট ও হাসানহাট হয়ে মাইজদী আঞ্চলিক মহাসড়কে যাওয়ার পথে ৪৯.০৬ মিটার দীর্ঘ আরসিসি ব্রিজটির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের ২৮শে অক্টোবর।

প্রথমে মেসার্স হক ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান সেতুটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায়। পরে ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্মাণকাজের দায়িত্বশীলদের পরিবর্তন করা হয়। এরপর হাতবদলের মাধ্যমে ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা নতুন ব্যয়ে মো. ফরহাদ নামে এক ঠিকাদার কাজটি পান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঠিকাদার পরিবর্তনের পর থেকেই সেতুর নির্মাণকাজে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম তাদের নজরে আসতে থাকে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগও দেওয়া হয়। পরে কিছু কাজ সংশোধন করা হলেও নির্মাণকাজের শেষ দিকে আবারও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শেষের দিকে রাতের অন্ধকারে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে তার এবং নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার করে কোনো রকমে কাজ করে চলে যান ঠিকাদারের লোকজন। দিনের বেলায় পথচারীরা এসব স্ল্যাবের ওপর পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো ভেঙে পড়তে থাকে। সেতুর রেলিংয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ তাদের।

স্থানীয় যুবক মো. রাশেদ বলেন, ব্রিজটির নির্মাণকাজে শুরু থেকেই নানা অনিয়ম দেখা যাচ্ছে। এসব বিষয়ে তারা একাধিকবার এলজিইডিতে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন। এমনকি সরাসরি ঠিকাদারের লোকজনকেও অনিয়মের বিষয়গুলো দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপরও তারা কাজের মান ঠিক না করে রডের বদলে চিকন তার ব্যবহার করে কোনো রকমে কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন।

অপর স্থানীয় যুবক মো. আব্দুল্লাহ বলেন, সেতুটির নির্মাণে তারা বিভিন্ন অনিয়ম দেখতে পেয়েছেন। একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব অনিয়ম তুলে ধরেছেন তারা। তার অভিযোগ, দিনে কাজ না করে রাতের অন্ধকারে কাজ করা হচ্ছে।

মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ব্রিজটি দিয়ে বেগমগঞ্জ, করিরহাট ও সদর উপজেলার চার ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ চলাচল করবে। জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিম্নমানের কাজের কারণে এখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় কে নেবে, সেটিই তাদের প্রশ্ন।

স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি চান। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, সোমবার নির্মাণাধীন সেতুটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এলজিইডির সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা।

পরিদর্শনে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবের কাজ নিম্নমানের এবং নকশা ও স্পেসিফিকেশন-বহির্ভূত বলে দেখা যায়। একইভাবে রেলিংয়ের রডের কাজও নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হয়।

নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, তিনি নিজে সরেজমিনে গিয়ে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবের নিম্নমানের কাজ দেখতে পান। পরে ঠিকাদারের লোকজনকে দ্রুত স্ল্যাবগুলো ভেঙে অপসারণের নির্দেশ দিয়ে আসেন।

সেই নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার এলজিইডির লোকজনের উপস্থিতিতে ফুটপাতের স্ল্যাবগুলো ভেঙে ফেলা হচ্ছিল। এ সময় উৎসুক লোকজন মোবাইল ফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।

যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল আরও বলেন, সেতুর স্ল্যাব ও রেলিংয়ের যেসব স্থানে নিম্নমানের কাজ করা হয়েছিল, সেগুলো ভেঙে অপসারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, তিনি নিজে ছাড়াও জেলা, উপজেলা এবং ঢাকা থেকে এলজিইডির একাধিক দল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

তিনি জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হক ট্রেডার্সকে দেওয়া চিঠিতে নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণকাজের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নকশা ও স্পেসিফিকেশন-বহির্ভূত কোনো কাজের বিল পরিশোধ করা হবে না বলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে মেসার্স হক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, কাজটি হক ট্রেডার্স পেলেও তারা নিজেরা তা করছেন না। তাদের লাইসেন্স ব্যবহার করে সেনবাগের কয়েকজন ব্যক্তি মিলে কাজটি করছেন। তাদের মধ্যে একজনের নাম ফরহাদ।

ঠিকাদার মো. ফরহাদ বলেন, ব্রিজটির নির্মাণকাজ তারা শুরু থেকেই ভালোভাবে করে আসছেন। কয়েক দিন আগে তার অজান্তে ব্রিজের ফুটপাতের স্ল্যাব ও রেলিংয়ের কাজে কিছু ত্রুটি ধরা পড়ে।

বিষয়টি জানার পর এলজিইডির প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে স্ল্যাব ও রেলিংয়ের যেসব অংশের কাজ ভালো হয়নি, সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী ওই অংশগুলো নতুন করে নির্মাণ করে দেওয়া হবে।

এদিকে এ ঘটনায় বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল।

নোটিশে দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়ে তাদের আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দিলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার আগেই তাকে বদলি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ।

তিনি বলেন, বেগমগঞ্জে যোগদানের পর তার দুই মাস হয়েছে। ব্রিজটির কাজে অনিয়মের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কাজের মান খারাপ হওয়া স্থানগুলো ভেঙে অপসারণ করেছেন। বৃহস্পতিবার তিনি জানতে পারেন, তাকে রাঙামাটি জেলায় বদলি করা হয়েছে।

আবুল মনসুর আহমেদ আরও জানান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম এবং ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. মহিন উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এলজিইডি নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, ব্রিজটির নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নোয়াখালী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ.এস.এম মহসীনকে প্রধান করে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে বিষয়টি তদন্ত করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সদস্য এ.এস.এম মহসীন বলেন, তদন্ত কমিটি গঠনের চিঠি পাওয়ার পর তিনি সরেজমিনে ব্রিজটি পরিদর্শন করেছেন। প্রাথমিকভাবে নির্মাণকাজে কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে রোববারের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবেন তিনি।

এ ঘটনায় বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদকে বদলি করা হয়েছে বলেও জানান এ.এস.এম মহসীন। তবে কাউকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিষয়টি তার জানা নেই বলে তিনি বলেন, “তবে কাউকে সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি জানা নেই।”

Visited 2 times, 2 visit(s) today