বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সহিংস ও উগ্রপন্থী নীতি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনের জন্য দায়ী। তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা অসাংবিধানিক, এতে কোটি কোটি সমর্থক আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেবে না।
গত বছর আগস্টে তাঁর সরকারকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে উৎখাতের পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। বৃহস্পতিবার রাতে হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানান, “ইউনূস তার সরকারে উগ্রপন্থীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, যা বাংলাদেশ ও ভারতের মৌলিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।”
একইসাথে তিনি ভারতের জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর ভারতে অবস্থানগত কারণে।
সাক্ষাৎকার পর্ব
হিন্দুস্তান টাইমস: ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, আপনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি করেছে। তারা আপনার প্রত্যর্পণও চেয়েছে। আপনি এ বিষয়ে কী ভাবছেন?
শেখ হাসিনা: ভারত সবসময়ই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিল, এবং ভবিষ্যতেও থাকতে হবে—বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির স্বার্থে। যদি ভারত ও ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের মধ্যে কোনো টানাপোড়েন তৈরি হয়ে থাকে, তার জন্য আমি দায়ী নই। এর মূল কারণ হলো ড. ইউনূসের শাসনে গড়ে ওঠা বিশৃঙ্খল, সহিংস ও উগ্র নীতি। এই নীতির মধ্যে রয়েছে সংখ্যালঘুদের ওপর শারীরিক ও আইনি হামলা, সমাজ ও ধর্ম বিষয়ে পশ্চাদগামী অবস্থান, এমনকি ঢাকা থেকে ভারতের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্যও।
আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এই ধরনের শত্রুতামূলক আচরণ সমর্থন করে না। আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, গভীর এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো। আমরা গর্ব করি যে বাংলাদেশ ভারতের এক নির্ভরযোগ্য বন্ধু। ব্যক্তিগতভাবে আমি বলতে চাই, গত এক বছরে আমাকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার জন্য ভারতের জনগণের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
হিন্দুস্তান টাইমস: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায় দিতে যাচ্ছে, যেখানে আপনার ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করা হয়েছে। আপনি এই মামলাগুলো কীভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনা: আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ আমি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছি। এই মামলাগুলো এমন এক তথাকথিত আদালতে চলছে, যা আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিয়ন্ত্রণে এবং যারা সম্পূর্ণভাবে অগণতান্ত্রিক উপায়ে, বেআইনিভাবে ক্ষমতা দখল করেছে। মনে রাখবেন—এই অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে এখনো কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ভোট দিতে পারেননি। তাদের কাছে জবাবদিহি বা বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতার কোনো মূল্য নেই।
আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে—যে আমি নাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলাম— অথচ, এর পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখানো যায়নি। আদালতে উপস্থাপিত অডিও রেকর্ডিং ও লিখিত নথি বিকৃত করা হয়েছে এবং প্রসঙ্গের বাইরে নেওয়া হয়েছে। যদি একটি প্রকৃত স্বাধীন আদালত থাকত, আমি এই ভুয়া প্রমাণগুলো চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পেতাম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে বাংলাদেশে এমন কোনো আদালত নেই।
আমি আমার কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে ভয় পাই না। আমি বহুবার ইউনূস প্রশাসনকে আহ্বান জানিয়েছি—যদি তাদের সাহস থাকে, তাহলে এসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করুক, যেখানে ন্যায্য বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে। কিন্তু তারা তা করবে না, কারণ তারা জানে—সেখানে তাদের মনগড়া রায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
হিন্দুস্তান টাইমস: অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম অ্যান্টি-টেররিজম অ্যাক্টের আওতায় বন্ধ করেছে এবং নির্বাচন কমিশন দলের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। ফলে আওয়ামী লীগ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। আপনি ও আওয়ামী লীগ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনা: দেশের সবচেয়ে পুরনো এবং জনপ্রিয় দলকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করলে গণতন্ত্রের কোনো আশা থাকে না। এই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের সংবিধান ও ১ কোটি ৭৩ লাখ জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘন করছে। যদি এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে, কোটি কোটি সাধারণ বাংলাদেশি ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তারা ভোট দিতে যাবে না। যদি মানুষ তাদের পছন্দের দলের জন্য ভোট দিতে না পারে, তখন বাংলাদেশ সত্যিকারের গণমতে সরকার গঠনের সুযোগ হারাবে—যা হবে একটি বড় দুঃখজনক ঘটনা।
দল হিসেবে আমরা- আওয়ামী লীগ এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনি, কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণভাবে লড়াই চালিয়ে যাব, যাতে সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচনের অধিকার ধরে রাখতে পারে। আওয়ামী লীগ ৯ বার জনগণের সরাসরি ভোটে ক্ষমতায় এসেছে। দল কখনো সংবিধানবিরোধী বা বেআইনি উপায়ে ক্ষমতা দখল করেনি। এর বিপরীতে, ড. ইউনূসের পক্ষে কখনো কোনো বাংলাদেশি ভোট দিতে পারেননি।
হিন্দুস্তান টাইমস: ভারত সরকার বলেছে, বাংলাদেশের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও সকলের জন্য উন্মুক্ত হতে হবে। আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন কি বৈধতা পাবেনি বলে আপনি মনে করেন?
শেখ হাসিনা: এই নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্যায় নয়, এটি স্বয়ং-বিপর্যয়কর। এর ফলে আগামী সরকার নির্বাচনীভাবে বৈধ হবে না, কারণ লাখ লাখ ভোটার কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য আমাদের প্রধান আশা হলো সংবিধানভিত্তিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। এটি অর্জনের একমাত্র পথ হলো অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
হিন্দুস্তান টাইমস: অন্তর্বর্তী সরকার অভিযোগ করেছে, ২০২৪ সালের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পক্ষের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমনমূলক কার্যক্রমে আপনার সরাসরি ভূমিকা ছিল। জাতিসংঘ জানিয়েছে, জুলাই-অগাস্ট ২০২৪ সালের বিক্ষোভে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে। আপনি এই অভিযোগের কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন?
শেখ হাসিনা: আমার ওপর যে অভিযোগ এসেছে, আমি নাকি ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলাম, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এই অভিযোগগুলো আমার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে একটি অনির্বাচিত সরকারের দ্বারা, যারা তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে চায়। নিরাপত্তা বাহিনীর মাঠপর্যায়ের কাজকে সরাসরি সরকারের নির্দেশ হিসেবে দেখানো সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা।
নিঃসন্দেহে কিছু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা ভুল হয়েছে। কিন্তু এটি বোঝানো যে- আমি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে প্রতিমিনিটে তাদের কৌশলগত নির্দেশনা দিচ্ছিলাম! অথচ এটি নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মপদ্ধতি বিষয়ে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর তথ্য। আমি পুনরায় বলছি—আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণের ওপর গুলি চালানোর অনুমতি দিইনি।
গত বছরের বিক্ষোভে নিহত সকলের জন্য আমি ব্যথিত। ঢাকার রাস্তাগুলো তখন আইনশৃঙ্খলাহীন এবং সংঘাতময় ছিল, এবং আমাদের পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল প্রাণহানি কমানো এবং সংবিধান রক্ষা করা। প্রথম মৃত্যুর ঘটনার পর আমরা একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলাম, যা আইনশৃঙ্খলার ভঙ্গ এবং দুঃখজনক ঘটনাগুলোর কারণ অনুসন্ধান করত। কিন্তু ইউনূস প্রশাসন ক্ষমতা নিয়ে প্রথম দিনেই এই তদন্ত কমিশন বাতিল করে দেয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার।
এর ফলে বাংলাদেশিরা, বিশেষ করে শোকাহত পরিবারগুলো, সেই ঘটনার বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য উত্তর পায়নি। বরং তাদেরকে বিভ্রান্তিকর, মনগড়া ও বিকৃত অভিযোগের মাধ্যমে তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের লক্ষ্য আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা। এসব অভিযোগে তাই প্রকৃত ঘটনা উঠে আসেনি।
হিন্দুস্তান টাইমস: আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর কাছে অনুরোধ করেছে, দলের নেতা ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে “প্রতিশোধমূলক সহিংসতা” তদন্ত করতে। আপনি কতটা আশাবাদী যে এটি সফল হবে?
শেখ হাসিনা: মানবতাবিরোধী অপরাধ ন্যায্যভাবে বিচার করা উচিত একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে, যেমন আইসিসি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক, বিচারপতি, সাংবাদিক ছাড়াও সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া প্রতিশোধমূলক সহিংসতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং বহু মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘ এটির নিন্দা করেছে।
আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বিরুদ্ধে কয়েক লাখ ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করা হয়েছে। কয়েক লাখ মানুষ ভুয়া অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই কারাগারে মারা গেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর তথ্য অনুযায়ী, ইউনূস প্রশাসনের ক্ষমতায় আসার প্রথম ১০০ দিনে প্রায় ১,০০০ পুলিশি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যার বৈধ কোনো ভিত্তি ছিল না।
এসব ঘটছে বর্তমানে, ইউনূস প্রশাসনের অধীনে। ইউনূস এবং তার সহযোগীরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ব্যবহার করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করছে, যেন তারা এই অন্যায়-অবিচারগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাতের সুযোগ না পায়। এজন্য আমাদের একটি ন্যায্য ও স্বাধীন বিচারিক সংস্থা, যেমন আইসিসি, প্রয়োজন—যা বর্তমান অসংবিধানিক কাজগুলো খতিয়ে দেখবে এবং ইউনূস প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে।
হিন্দুস্তান টাইমস: ভারত সরকার বারবার অভিযোগ করেছে, ইউনূস প্রশাসন বাংলাদেশের হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আপনি এই বিষয়ে কী মনে করেন?
শেখ হাসিনা: আমাদের শাসনামলে আমরা ধর্মীয় সহনশীলতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখায় গর্বিত ছিলাম। তাই আমাদের সংবিধানের মূল্যবোধকে ধর্মীয় সহিংসতা ও নির্যাতনের মাধ্যমে ক্ষুণ্ণ হতে দেখাটা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। ইউনূসের শাসনের প্রথম সপ্তাহগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সহিংসতা চরম আকার ধারণ করে, যা লজ্জাজনক।
এছাড়া আজও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা চলছেও, এবং ইউনূস তা অস্বীকার করছেন।
বাংলাদেশ সবসময়ই নিপীড়িতের পাশে ছিল, নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা মানুষের জন্য নিরাদ আশ্রয়স্থল ছিল। তাই আমরা মায়ানমারের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা সাড়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে স্বাগত জানিয়েছিলাম, সহায়তা ও সুরক্ষা দিয়েছি। কিন্তু এখন উগ্রপন্থা এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে এই পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
ড. ইউনূস ১৯৯০ সালে গ্রামীণ ব্যাংকে মাত্র ৬,০০০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেছিলেন। তাহলে তিনি এত বিপুল সম্পদ কীভাবে অর্জন করেছেন? ক্লিনটন ফাউন্ডেশন এবং হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচারে দেওয়া বড় অঙ্কের অনুদান কোথা থেকে এসেছে? আজ বলা হয়, তার নামে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। উপরন্তু, তার বিরুদ্ধে কর ফাঁকিরও মামলা রয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমস: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেওয়ার কারণে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে ইউনূস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর। এছাড়া উগ্রবাদীদের পুনরুত্থান এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাড়তে থাকা ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও উঠেছে। এসব ঘটনার ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
শেখ হাসিনা: আমাদের শাসনামলে আমরা উগ্রবাদীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলাম এবং দেশের সব নাগরিক—ধর্ম নির্বিশেষে—নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে জীবন যাপনের সুযোগ পেতেন। এই মূল্যবোধগুলো আমাদের সংবিধানে সংরক্ষিত। কিন্তু আজ ঢাকার রাস্তাগুলো আর নিরাপদ নয়, এবং লাখ লাখ সাধারণ বাংলাদেশি তাদের ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। আমরা ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে উগ্র ইসলামপন্থী ধারার বিস্তার দেখেছি—ক্রমশ এটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগের সদস্য বা নারীদের ওপর সহিংসতা এবং বৈষম্যের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।
ভারত সবসময়ই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও পরম মিত্র। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে এই অরাজকতা ও উগ্রপন্থী কর্মকাণ্ড ভারতের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না। ইউনূস সরকারের উগ্রপন্থীদের পৃষ্ঠপোষকতা নিঃসন্দেহে এই উষ্ণ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা উভয় দেশের জন্য ক্ষতিকর।
হিন্দুস্তান টাইমস: আপনার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও ট্রানজিট সম্পর্ক এবং বহু উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল। আপনি কি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড এসব প্রকল্পের ক্ষতি করেছে, বিশেষ করে চীন ও পাকিস্তানের বাংলাদেশের উপর বাড়তে থাকা প্রভাবের প্রেক্ষাপটে?
শেখ হাসিনা: এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে, একসময় আমাদের উচ্চবৃদ্ধির অর্থনীতি এখন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আসলে, গত এক বছরে আইএমএফ কয়েকবার বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং হ্রাস করেছে। আমরা বাংলাদেশকে এলডিসি পর্যায় থেকে উত্তরণের পথে এগিয়েছিলাম, আর এখন আমাদের অর্জিত অর্থনৈতিক উন্নতি এইভাবে হুমকির মুখে পড়েছে তা দুঃখজনক।
গত দুই দশকে যা অর্জন করেছি তা ছিল বিস্ময়কর: অর্থনীতি ৪৫০% এর বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, শতভাগ বিদ্যুতায়ন এবং কোটি কোটি মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও ট্রানজিট উন্নয়ন অবশ্যই সেই বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, এবং এর মাধ্যমে আমাদের দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছিল।
এই অগ্রগতি এত সহজে অর্জিত হয়নি। তাই আমার হৃদয় ভেঙে যায় যখন মূল উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বিলম্বিত হচ্ছে এবং অদূরদর্শী নীতি গ্রহণ ও বাংলাদেশের বিদেশনীতির ব্যাপক পুনর্গঠনের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
