নিজস্ব প্রতিবেদক
লুটপাটে বিপর্যস্ত শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন, এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী—একীভূত করে নতুন ইসলামী ব্যাংক গঠনের নামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সর্বস্ব হারানোর পথে ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের ঘোষণার মাধ্যমে বলা হয়েছে, এসব ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য ‘শূন্য’ ধরা হবে। অর্থাৎ, লাখো সাধারণ বিনিয়োগকারী একটাকাও ফেরত পাবেন না।
ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীরা বলছেন, উদ্যোক্তা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী লুট করেছে, কিন্তু তার দায় চাপানো হচ্ছে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ওপর। বিনিয়োগকারীদের ভাষায়—“লুটপাট ব্যাংকের, শাস্তি বিনিয়োগকারীর।”
মতিঝিলে ডিএসই ভবনের সামনে গতকাল বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও অর্থ উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করা হয়।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেছেন, বর্তমান সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণের টাকায় লুটেরাদের দায় মওকুফ করছে। আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচিরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
মিজানুর রশিদ চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখের সামনেই লুটপাট হয়েছে। এখন তার দায় সাধারণ বিনিয়োগকারীর ওপর চাপানো হচ্ছে। এটি আর্থিক প্রতারণার শামিল।”
আরেক নেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “যখন ব্যাংকগুলোকে ‘ইসলামী ও শক্তিশালী’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছিল, তখনই বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলা হয়েছে। এখন শেয়ার জিরো ঘোষণা করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কী করছিল?”
সমালোচনার মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের সুযোগ আপাতত নেই।” তবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ সরকার চাইলে বিবেচনা করতে পারে। বিনিয়োগকারীদের মতে, এটি দায় এড়ানোর কৌশল ছাড়া কিছু নয়।
পুঁজিবাজার সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ ব্যাংকের উদ্যোক্তা-পরিচালক ছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ার গড় ৭৬ শতাংশ। এসব শেয়ারের অভিহিত মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা, যা কার্যত উধাও। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ১ হাজার ১৩৭ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৮৩৫ কোটি, এক্সিমে ৯৭৮ কোটি, ইউনিয়নে ৪৭২ কোটি এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১ হাজার ৮ কোটি টাকা বিনিয়োগকারীদের রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৭ শতাংশ। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৮ শতাংশ, ফার্স্ট সিকিউরিটির ৯৬, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৯৫ শতাংশ। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এসব ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, কিন্তু তাদের নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, “শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীদের অবস্থান নির্ধারণ না করেই শেয়ার জিরো ঘোষণা এক ধরনের রাষ্ট্রীয় অন্যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই নজরদারি ব্যর্থতার দায়ে অভিযুক্ত।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, “আইনি দিক থেকে শেয়ারহোল্ডার ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন না, কিন্তু ক্ষতি হয়েছে জালিয়াতির কারণে। তাই নিয়ন্ত্রকের দায়ও অস্বীকারযোগ্য নয়।”
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, “লিকুইডেশনে গেলে সম্পদ বিক্রি করে দায় শোধ করা হয়, কিন্তু এখানে কোনো হিসাবই দেওয়া হয়নি। সবকিছু পর্দার আড়ালে।”
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের মুখপাত্র মো. মহসিন বলেন, একীভূত ব্যাংকে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার দিতে হবে, বেনামে থাকা সম্পত্তির মালিকানা বিনিয়োগকারীদের দিতে হবে, এস আলম গোষ্ঠীর সম্পদ ব্যাংকের সম্পদমূল্যে যোগ করতে হবে এবং ব্যাংক লুটে জড়িত কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সরকারের এই সিদ্ধান্ত শুধু পাঁচ ব্যাংকের নয়—পুরো পুঁজিবাজারের জন্য বিপজ্জনক বার্তা। রাষ্ট্রীয় সংস্থা যদি বিনিয়োগকারীর ক্ষতি নিশ্চিত করে, তাহলে বাজারে আর কেউ আস্থা রাখবে না। তাঁরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত লুটের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অবিশ্বাসের গভীর খাদে ঠেলে দিচ্ছে।
