নিজস্ব প্রতিবেদক। সিলেট, ১১ আগস্ট ২০২৫।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র সাদা পাথর এলাকা অবৈধ পাথর লুটপাটের কারণে প্রায় শূন্য হয়ে পড়েছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে এই এলাকায় নির্বিচারে পাথর লুট চলছে। স্থানীয় সূত্র ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, গত ১০ মাসে সাদা পাথর এলাকা থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে, যা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং পরিবেশ ও পর্যটন খাতের জন্য বিপর্যয়কর। এই লুটপাটের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে। তবে, এই বিপর্যয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, যিনি পরিবেশ রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।
লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র
সাদা পাথর, যা ধলাই নদীর উৎসমুখে অবস্থিত, তার সাদা পাথর ও স্বচ্ছ জলধারার জন্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে বিখ্যাত। এই এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্বের কারণে এটি পরিবেশ-সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষিত। কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর থেকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি শিথিল হওয়ায় এবং পুলিশ ও বিজিবির অনুপস্থিতিতে, হাজার হাজার শ্রমিক এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠী দিন-রাত পাথর লুট করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রায় ১ কোটি ঘনফুট পাথর লুট হয়েছে, যার বাজারমূল্য ২০০ কোটি টাকারও বেশি।
প্রতিদিন শত শত নৌকা এবং ট্রাকের মাধ্যমে পাথর পরিবহন করা হচ্ছে। এই লুটপাটের ফলে সাদা পাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ম্লান হয়ে গেছে, এবং পর্যটনকেন্দ্রটি কার্যত ধ্বংসের মুখে। পর্যটকরা হতাশা প্রকাশ করছেন, কারণ জলধারার সঙ্গে পাথরের সৌন্দর্য এখন আর নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই এলাকায় এখন ছোট-বড় গর্ত আর ধু-ধু চরই কেবল অবশিষ্ট।
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব
লুটপাটের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের, বিশেষ করে বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাদের, জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। জাফলং ও সাদা পাথরে পাথর লুটের ঘটনায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা রফিকুল ইসলাম শাহপরানের পদ স্থগিত করা হয়েছে, এবং অন্যান্য নেতাদের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের হয়েছে। তবে, এই মামলাগুলোর বেশিরভাগই বিচারাধীন বা তদন্তাধীন, এবং মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এই লুটপাটকে উৎসাহিত করেছে। গত ১৪ জুন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জাফলং পরিদর্শন করলেও তিনি পাথর লুটপাটকারীদের প্রতিবাদের মুখে পড়েন। স্থানীয় ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দলের নেতারা তার গাড়িবহর আটকে দেয়, যা প্রশাসনের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক চাপের প্রমাণ।
পরিবেশ উপদেষ্টার ব্যর্থতার চিত্র
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ভূমিকা এই সংকটে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি একজন পরিবেশ আইনবিদ হিসেবে পরিচিত হলেও, সাদা পাথর এবং জাফলংয়ের মতো পরিবেশ-সংকটাপন্ন এলাকাগুলো রক্ষায় তার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। তার নেতৃত্বে পরিবেশ অধিদপ্তর ৯টি মামলা দায়ের করলেও, মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যিনি পরে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এটি তার নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক অক্ষমতার প্রমাণ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর সিলেটের সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার প্রথম আলোকে বলেন, “প্রশাসন পাথর লুটপাট ঠেকাতে কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না।” এই সমালোচনা সরাসরি উপদেষ্টার ব্যর্থতার দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি জাফলং পরিদর্শনের সময় পাথর কোয়ারি চালুর দাবির মুখে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন। তার পরিবর্তে, তিনি কোয়ারির ইজারা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন, যা লুটপাট বন্ধে কোনো কার্যকর ফল দেয়নি।
সৈয়দা রিজওয়ানার নিষ্ক্রিয়তা পরিবেশ রক্ষায় সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। সাদা পাথরের মতো একটি পর্যটনকেন্দ্র ধ্বংসের মুখে পড়লেও তিনি কোনো কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন বা নিয়মিত অভিযানের ব্যবস্থা করতে পারেননি। তার দায়িত্বহীনতার কারণে পর্যটন খাতের ক্ষতি, পরিবেশ ধ্বংস এবং সরকারের রাজস্ব হ্রাস পেয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
সাদা পাথরের লুটপাট শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি পরিবেশ ও পর্যটন খাতের জন্য অপূরণীয় বিপর্যয়। এই এলাকার জলধারা ও পাথরের সৌন্দর্য পর্যটকদের মূল আকর্ষণ ছিল। এখন পাথরশূন্য এলাকাটি পর্যটকদের হতাশ করছে, যা স্থানীয় অর্থনীতির উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী বলেন, “গত ১০ মাসে যে পরিমাণ লুটপাট হয়েছে, তা অতীতে কখনো দেখা যায়নি।”
সাদা পাথরের লুটপাট বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান, এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবেশ উপদেষ্টার উচিত একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করে লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং জাফলং ও সাদা পাথরের মতো ইসিএ এলাকাগুলোর সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।
সিলেটের সাদা পাথর এলাকায় অবৈধ পাথর লুটপাট দেশের পরিবেশ ও পর্যটন খাতের জন্য একটি বিপর্যয়। এই লুটপাটের জন্য প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দায়ী হলেও, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। তার নিষ্ক্রিয় নেতৃত্ব এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাব সাদা পাথরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা, পরিবেশ রক্ষায় তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন, কিন্তু তার ব্যর্থতা দেশের পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষায় একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। সরকারের উচিত এই ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাদা পাথরের মতো মূল্যবান সম্পদ রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
