নিজস্ব প্রতিবেদক
সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলের বালু-পাথর মহলুটপাট পর্বের পর এবার সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী ধোপাজান নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিনে রাতের আঁধারে সিলিকা বালু লুট করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিন অন্তত ৫ কোটি টাকার বালু লুট করছে একটি সিন্ডিকেট। গত এক মাসে লুট হয়েছে শত কোটি টাকারও বেশি সিলিকা (সিলেটি) বালু। অবৈধ ড্রেজারে বালু লুটের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে নদী। নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি হুমকিতে পড়েছে। তারা প্রতিবাদ করলে সুনামগঞ্জ শহর থেকে ক্যাডাররা গিয়ে তাদের হুমকি ধমকি দিয়ে আসছে।
এদিকে জেলা প্রশাসন বালু উত্তোলনের অনুমোদন বাতিলের জন্য চিঠি দিলেও সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ আমলে নিচ্ছেনা। বিআইডব্লিউটিএ’র দুর্নীতিবাজ একটি চক্র হাজার কোটি টাকার সিলিকা বালুর নদীকে মাত্র ৬৬ লাখ টাকায় এক বছরের জন্য ভিট বালু তোলার অনুমতি দিয়ে ঘুষ নিয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। বালু লুটে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ক্ষমতার প্রভাবে অবৈধ অনুমতি
ক্ষমতার প্রভাবে বিআইডব্লিউটিএ-কে ম্যানেজ করে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ইজারা বন্ধ থাকা বালু-পাথর মহালটি মাত্র ৬৬ লাখ টাকায় এক বছরের জন্য ভিট মাটি উত্তোলনের অনুমতি নেয় লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি সিন্ডিকেট। সেই অনুমতির আড়ালে এখন রাতে শত শত ড্রেজারে সিলিকা বালু লুট করছে তারা।
সুনামগঞ্জ-সিলেট চারলেন মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে মাটি সরবরাহের কথা বলে এই অনুমতি নেওয়া হলেও সংগৃহীত বালু সারাদেশেই প্রকাশ্যে বিক্রি করছে লিমপিড ও তাদের বালু খেকো চক্র।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মালিকানাধীন এনজিও পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা এ নিয়ে মামলা করেছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। ফলে ২০১৮ সাল থেকেই নদীটির ইজারা বন্ধ রয়েছে। তাই খনিজ সম্পদ বালুতে ভরা নদীটি নামমাত্র টাকায় অনুমতি নিয়ে প্রতিদিন লুট করছে মূল্যবান সিলিকা বালু।
আদালতের নির্দেশ অমান্য
২০১২ সালে বেলা ধোপাজান নদীতে ড্রেজার ব্যবহারের বিরুদ্ধে মামলা করলে আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উত্তোলন চলতে থাকায় ২০১৪ সালে তারা আদালত অবমাননার মামলা (নং ২২৪) দায়ের করে। এরপর ২০১৮ সাল থেকে ইজারা বন্ধ রয়েছে।
কীভাবে বালু পাথরের রিজার্ভ নদী বন্দোবস্ত নেওয়া যায় সেই চেষ্টা চালায় বালুপাথর খেকো সিন্ডিকেট। তাই তারা স্থানীয় বিএনপি ও বিআইডব্লিউটিএর দুর্নীতিবাজ চক্রের সঙ্গে মিশে কৌশলে খনিজ স¤পদ মন্ত্রণালয়ে বালু পাথর মহালটি বিধি বহির্ভূতভাবে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে মাটি তোলার অনুমতি নিয়েছে।
অথচ সীমান্ত এই নদীটি সরকারি বালু পাথর মহাল হিসেবে স্বীকৃত এবং এখানে কোনও মাটি নেই।
নতুন করে লুটের মহোৎসব
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় বারকি শ্রমিক সূত্রে জানা যায়, লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান ১০ই অক্টোবর থেকে প্রতিরাতে ১০০টি ড্রেজার মেশিনে বালু উত্তোলন করছে। এক মাসে তাদের লুটের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
বিআইডব্লিউটিএ দিনে সীমিত এলাকায় ভিট মাটি তোলার অনুমতি দিলেও, প্রতিষ্ঠানটি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাতে স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বালু লুট করছে। এতে নদীতীরবর্তী গ্রামগুলো ভাঙনের ঝুঁকিতে, আর ২০ হাজারের বেশি বারকি শ্রমিক জীবিকা হারাচ্ছে। প্রতিবাদ করায় শ্রমিক ও স্থানীয়দের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে।
ইতোমধ্যে অন্তত ১০টি মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, একটি মামলা ও একাধিক স্মারকলিপি দেওয়া হলেও বালু লুট থামেনি। বরং প্রতিদিন ড্রেজারের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বিআইডব্লিউটিএ বিধিবহির্ভূতভাবে লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিংকে অনুমতি দিয়েছে, যদিও ধোপাজান নদীতে ভিট মাটি নয় সিলিকা বালু রয়েছে। আইনগতভাবে বিআইডব্লিউটিএ এই নদী থেকে বালু তোলার অনুমতি দিতে পারেনা এবং আদালত অবমাননার মামলা থাকায় সেটা কোনওভাবেই পারেনা। তাই বিআইডব্লিউটিএ একদিকে আদালত অবমাননা করেছে অন্যদিকে এখতিয়ার বহির্ভূত খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কোয়ারি ইজারা দিয়ে সরকারি বিপুল রাজস্ব বঞ্চিত করেছে। প্রাণ ও প্রকৃতি এবং নদীকে বিপন্ন করে তোলেছে।
গত ২২শে জুন লিমপিড আবেদন করার পর ৯ই জুলাই বিআইডব্লিউটিএ অনুমতি দেয়। অনুমতিপত্রে ১ কোটি ২১ লাখ ২০ হাজার ১২৯ ঘনফুট ভিট মাটি উত্তোলনের সীমা থাকলেও, সিন্ডিকেট প্রতি রাতে ৫ কোটি টাকার বালু লুট করছে। বিক্রি করছে সারাদেশে। অথচ এই মাটি ও বালু সিলেট-ঢাকা সড়কে ব্যবহার করার কথা বলেই তারা অনুমতি নিয়েছে।
কিন্তু সরেজমিন এই সড়কে ব্যবহারের কোনও চিত্র দেখা যায়নি। বরং ঢাকাসহ সারাদেশে কার্গো ও ভলগেটে বিক্রি করতে দেখা গেছে।
অক্ষয়নগর থেকে ডলুড়া পর্যন্ত নদীর দুই তীরে চলছে বালু লুটের মহোৎসব। উত্তোলিত বালু কার্গো ও ভলগেট নৌকায় করে ওয়েজখালি, জলিলপুর, জয়নগর, জামালগঞ্জ, সদরগড় ও অক্ষয়নগরসহ বিভিন্ন স্থানে স্তুপ করে পরে ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতি ঘনফুট বালু ৭৫ টাকায় বিক্রি করছে চক্র।
স্থানীয়দের বিক্ষোভ ও মামলা
অবৈধ বালু উত্তোলনের অনুমতি বাতিলের দাবিতে স্থানীয় জনগণ, বারকি শ্রমিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করেছে। এমনকি জেলা প্রশাসনও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে পত্র পাঠিয়ে অনুমতি বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএর সচিব মোটা অংকের ঘুষ খাওয়ায় তিনি বালু লুটকারীদের থামানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন না এবং স্থানীয় প্রশাসনকেও বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে।
নদীতীরবর্তী জমির মালিক গোলাম হোসেন অভি লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন এবং ৬ই নভেম্বর বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ শহরে মানববন্ধন করেছেন। মামলা করার পর থেকে তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেট
তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের একাধিক নৌঘাট ইজারা নিয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্র। তারা ঘুষ দিয়ে ধোপাজান নদীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
তাহিরপুরের বাসিন্দা ও সুনামগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত আনিসুল হক তার দুই ভাই এনামুল ও আনোয়ারুল হককে দিয়ে বিআইডব্লিউটিএর ঘাট নিয়ন্ত্রণ করছেন। যাদুকাটা ও ধোপাজান নদীতে বালু লুটের বড় অংশীদারও তিনি।
জানা গেছে, ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বালু লুট আরও বেড়ে যায়। আনিসুল হকের ভাইয়েরা তাদের ব্যবসায়িক অংশীদার সুমনসহ বিআইডব্লিউটিএর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে নদী নিয়ন্ত্রণে নেয়। স্থানীয় নদীখেকো চক্রদের সহযোগিতায় তারা রাতে ড্রেজারে বালু লুট করছে।
বর্তমানে ধোপাজান নদী তীরবর্তী গ্রামের মানিক মিয়া, মনা, রমজান আলী, জাকির হোসেন, আল আমিন, জায়েদ আলী, বাবুল, জামায়াত নেতা মকবুল, মমিন, সুমন, অমল, ইকবাল ও সাজু মিয়াসহ আরও অনেকে এই লুটে যুক্ত রয়েছেন।
এছাড়াও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নূরুলের ঘনিষ্ঠজন যুবদল নেতা কামরুল হাসান রাজু, মমিনুল হক কালাচান ও সোহেল আহমদ নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে অভিযোগ। কেউ বাধা দিলে সন্ত্রাসী পাঠিয়ে হুমকি দিচ্ছে কালাচান ও সোহেল।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
ধোপাজান নদী থেকে ভিট মাটি উত্তোলনের অনুমতি বাতিলের দাবিতে ২৪শে আগস্ট জেলা প্রশাসন চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমতি ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, নদীটিতে পাথর মিশ্রিত সিলিকা বালু রয়েছে বলে জানানো হয়। চিঠিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, বিআইডব্লিউটিএর এই অনুমতির ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাবে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে। চিঠিটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হয়। কিন্তু সচিব মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে অনুমতি দেওয়ায় চিঠির সুফল পাননি জেলাবাসী। বরং তিনি দ্রুত বালু লুট করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন লিমপিডের বালু খেকো চক্রকে।
শ্রমিকদের ক্ষোভ
ধোপাজান নদীর উপর অন্তত ২০ হাজার বারকি শ্রমিকের জীবন আবর্তিত হয়। নদী ইজারা হলে তারা সনাতন পদ্ধতিতে বালু পাথর আহরণ করতেন। কিন্তু লিমপিড ড্রেজারে ইজারাবিহীন নদী থেকে বালু পাথর লুট করায় তারা কর্ম হারিয়েছেন। মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বারকি শ্রমিক নেতা হাফিজুর রহমান বলেন, ধোপাজান নদীটি ইজারা দিয়ে পরিবেশসম্মত সনাতন উপায়ে বালু-পাথর আহরণের দাবি জানিয়ে আন্দোলন করছি আমরা। কিন্তু সরকার হাজার কোটি টাকার সিলিকা বালুর নদী মাত্র ৬৬ লাখ টাকায় ইজারা দিয়েছে। এতে নদীর ঘরবাড়ি ও বাঁধও ভেঙে যাচ্ছে। অথচ নদীতে কোনও মাটি নেই। কেবল সিলিকা বালু। তারা শত কোটি টাকার বালু লুট করে নিয়েছে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতা ওবায়দুল হক মিলন বলেন, বিভিন্ন চক্র মিলে বিআইডব্লিউটিএর সহায়তায় ধোপাজান নদীর খনিজ বালু লুট করে নিচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএর নদী রক্ষার কথা বলে বালু খেকোদের দিয়ে নদী খুন করাচ্ছে। প্রকাশ্যে মাটির বদলে বালু লুটই করছেনা তারা ড্রেজার দিয়ে নদীর গতিপথ বদলে দিচ্ছে। মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিকে হুমকিতে ফেলে দিয়েছে।
লিমপিড কোম্পানির বক্তব্য
লিমপিড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কর্মকর্তা রাশেদ আলম বলেন সুমন ও কিছু লোককে আমরা দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি বলেন, মাটি ও বালু উত্তোলনের অনুমতি সরকার দিয়েছে। রাতে ড্রেজারে বালু উত্তোলনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আমরা যখন খুশি তুলতে পারব। অনুমতি নিয়েই তুলছি। ভিট মাটি তুলে সড়কে ব্যবহার করার কথা থাকলেও তারা প্রকাশ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছেন কেন জানতে চাইলে তিনি কোনও জবাব দিতে পারেন নি।
অভিযুক্ত সুমন মিয়া বলেন, আমরা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে কাজ করছি। আমরা ড্রেজারে বালু তুলছি। নির্ধারিত এলাকা থেকে দিনে মাটি তোলার কথা থাকলেও তারা কেন শত শত ড্রেজার দিয়ে রাতে বালু লুট করছে জানতে চাইলে বলেন, আমরা সবাইকে ম্যানেজ করেই করছি।
প্রশাসনের বক্তব্য
এদিকে ধোপাজান নদীর সিলিকা বালু লুটের প্রতিবাদে ও স্থানীয়দের ঘরবাড়ি জমি হুমকির মুখে পড়ায় জেলা প্রশাসনও উদ্বিগ্ন। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বালু-মিশ্রিত পাথর মহাল থেকে বিআইডব্লিউটিএ এক বছরের জন্য ভিট মাটি তোলার অনুমতি দিয়েছে। স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদীরা প্রতিবাদ করছে। আমি বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে অনুমতি বাতিলের অনুরোধ করেছি।
বিআইডব্লিউটিএর এডি শরিফুল আলমের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন ধরেননি।
