মতামত।। জনাব প্রেস সচিব, আপনি “মবের হোতা” নাকি স্বৈরাচারী?

মতামত।। জনাব প্রেস সচিব, আপনি “মবের হোতা” নাকি স্বৈরাচারী?
শেয়ার করুন

মৃণ্ময় সেন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রয়াণ দিবসে শোক কর্মসূচি পালনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের মৌলিক অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত। এই হুমকি কেবল জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে না, বরং জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলে। প্রেস সচিবের এই বক্তব্যকে সন্ত্রাস ও অশান্তির প্ররোচনা হিসেবে বিবেচিত, যা বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের জন্য গভীরভাবে ক্ষতিকর।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। প্রতি বছর এই দিনে জনগণ বঙ্গবন্ধুর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শোক কর্মসূচি পালন করে, যা কেবল শোকের প্রকাশ নয়, বরং জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতার চেতনার প্রতীক। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সরকারের আমলে, এমনকি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও, এই দিনে শোক প্রকাশে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। প্রেস সচিব শফিকুল আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই ঐতিহ্যের উপর একটি অভূতপূর্ব আঘাত এবং গণতন্ত্রের মূল মর্মের লঙ্ঘন।

প্রেস সচিবের বক্তব্যে “প্রেশার গ্রুপ বা মব” লেলিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ধরনের ভাষা সরাসরি সন্ত্রাস ও অশান্তির প্ররোচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং মতপ্রকাশের অধিকার সংবিধানে সুরক্ষিত। এটি ধারনা করা অবিবেচনাপ্রসূত হয় না যে, ৫ই ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি ৩২ এর ঐতিহাসিক স্থাপনা ভাঙ্গা পিছনেও প্রেস সচিবের সংযোগ রয়েছে।

শোক কর্মসূচির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য “মব” বা “প্রেশার গ্রুপ” ব্যবহারের ইঙ্গিত দেওয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রকাশ। এটি জনগণের মধ্যে ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যা দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। প্রেস সচিবের এই বক্তব্য বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ৩৮ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের পরিপন্থী। এই ধরনের হুমকি কেবল জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না, বরং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আদর্শ এবং গণতান্ত্রিক চেতনাকে অসম্মান করে।

শফিকুল আলম “মব” কে সবসময় “প্রেশার গ্রুপ” হিসাবে উল্লেখ করে মব দ্বারা কৃত অন্যায় অপরাধ সমূহকে লঘু করার চেষ্টা করেছেন। এতে করে বোঝা যায়, এই মব প্রেস সচিবের পারপাজ সার্ভ করছে বলেই এর প্রটি সহানুভুতিশীল ছিলেন প্রেস সচিব। এটা তাকে সন্ত্রাস ও অশান্তির প্ররোচনাকারী হিসেবে চিত্রিত করে।

এই ধরনের ভাষা একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে অগ্রহণযোগ্য। জনগণের শান্তিপূর্ণ শোক প্রকাশকে দমন করার জন্য সন্ত্রাসী শক্তি বা গোষ্ঠী ব্যবহারের হুমকি দেওয়া কেবল অগণতান্ত্রিক নয়, বরং দেশের আইন-শৃঙ্খলার জন্য হুমকি। এটি সরকারের নৈতিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতীক। তার প্রয়াণ দিবসে শোক প্রকাশ কোনো রাজনৈতিক দলের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা উচিত নয়; এটি জাতির সামগ্রিক অধিকার। প্রেস সচিবের এই হুমকি বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অস্বীকার করার পাশাপাশি জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।

প্রেস সচিবের এই হুমকি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবাদ দেখা গেছে, যেখানে অনেকে শফিকুল আলমকে “সন্ত্রাসের হোতা” হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই ধরনের হুমকি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিপন্ন করে এবং জনগণের মধ্যে ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এটি সরকারের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রকাশ। সাধারণ জনগণের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেন, “বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতির পিতা। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের অধিকার। এই হুমকি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি অশ্রদ্ধা।” এই ধরনের প্রতিক্রিয়া জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষের ইঙ্গিত দেয়।

প্রেস সচিব শফিকুল আলমের ১৫ আগস্ট শোক কর্মসূচির উপর হুমকি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের শোক প্রকাশের অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত। এই বক্তব্য সন্ত্রাস ও অশান্তির প্ররোচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো জাতির মৌলিক অধিকার, এবং এই অধিকারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ অগ্রহণযোগ্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত এই হুমকি অবিলম্বে প্রত্যাহার করে জনগণের শোক প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। জনগণের আস্থা ও ঐক্য রক্ষায় সরকারকে আরও সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন থাকে।

Visited 24 times, 1 visit(s) today