শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসরতা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছরে শিক্ষা খাতে বিশৃঙ্খলতা

শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসরতা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছরে শিক্ষা খাতে বিশৃঙ্খলতা
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ১১ই আগস্ট, ২০২৫।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতায় আসার এক বছর পূর্ণ হলেও বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ক্যাম্পাসে অশান্তি, শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ, এবং শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে শিক্ষা খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অধরা থেকে গেছে।

শিক্ষা খাতে সংস্কারের অভাব

ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু শিক্ষা খাত এই সংস্কারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। শিক্ষাবিদরা গত এক বছরকে শিক্ষা খাতের জন্য হারানো সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারা সরকারের কাছে একটি নিরপেক্ষ শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন, যা শিক্ষা খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অশান্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা আন্দোলনকারীদের চাপে পদত্যাগ করেন, কারণ তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই পদত্যাগ শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হতে এক মাসেরও বেশি সময় লেগেছে। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্যমতে, গত এক বছরে নিয়োগপ্রাপ্ত ৪৭ জন উপাচার্যের মধ্যে অন্তত ৩০ জন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক সংগঠনের সদস্য। উপাচার্য নিয়োগের জন্য একটি অভিন্ন নীতিমালার দাবি উঠলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এখনো এ বিষয়ে কোনো কাঠামো প্রণয়ন করেনি।

শিক্ষকদের উপর নিপীড়ন ও ছাত্র আন্দোলন

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও স্কুল ও কলেজে অশান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী অন্তত ১৫০ জন শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। অনেক শিক্ষককে হেনস্থা ও লাঞ্ছিত করা হয়েছে, এবং কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকদের উপর হামলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক নির্দেশনা জারি করলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। ছাত্র ও শিক্ষকরা বেতন বৃদ্ধি, পরীক্ষা স্থগিতকরণ এবং অটো-পাসের দাবিতে আন্দোলন করেছে, যার অনেকগুলো সহিংসতায় রূপ নিয়েছে

পাঠ্যক্রমে বিশৃঙ্খলা ও পাঠ্যপুস্তক সংকট

জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের সময় স্থগিত হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল করে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফল প্রকাশ করা হয়, যা শিক্ষাবিদদের সমালোচনার মুখে পড়ে। তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ পরে এই সিদ্ধান্তকে ভুল বলে স্বীকার করেন। এছাড়া, অভিভাবক ও শিক্ষকদের চাপে ২০১২ সালের পাঠ্যক্রমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ৫০টি পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণের দায়িত্ব পায়, কিন্তু ডিসেম্বর ২০২৪-এর সময়সীমা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। নতুন সময়সীমা জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হলেও, এপ্রিল পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক বিতরণ সম্পন্ন হয়নি। ফলে, অনেক জেলার শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তক ছাড়াই শিক্ষাবর্ষ শুরু করে, যা শিক্ষার ক্ষতির কারণ হয়েছে।

সংস্কারের অভাব ও হতাশা

গত মার্চে শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার নিয়োগ পান। তবে, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমেদ, যিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ কমিটির প্রধান ছিলেন, বলেন, “এখন পর্যন্ত শুধু খণ্ডিত পদক্ষেপ দেখা গেছে, কোনো ব্যাপক বা সুসংগত প্রতিক্রিয়া নয়।” তিনি শিক্ষা খাতে একটি ছয় মাস মেয়াদি সংস্কার কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, “এক বছরে সবকিছু বদলানো সম্ভব না হলেও, সম্ভাব্য কাজগুলোও সরকার করতে পারেনি।” তিনি শিক্ষা খাতে সংস্কার কমিশন গঠন না করার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

সরকারের বক্তব্য

শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সিআর আবরার বলেন, “যারা এক বছরে অলৌকিক পরিবর্তন আশা করেছিলেন, তাদের প্রত্যাশা অবাস্তব।” তিনি দাবি করেন, শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে এবং তরুণদের প্রত্যাশা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে, তিনি স্বীকার করেন, সব সিদ্ধান্ত আদর্শ ছিল না এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রত্যাশা অনুযায়ী পূরণ হয়নি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছরে শিক্ষা খাতে সংস্কারের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্থিরতা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষাবিদরা একটি সুসংগত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কাঠামোর দাবি জানাচ্ছেন, যাতে শিক্ষা খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়।

Visited 12 times, 1 visit(s) today