নিজস্ব প্রতিবেদক। ৪ঠা আগস্ট ২০২৫।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বাংলাদেশকে হালাল পণ্যের হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রচেষ্টার কথা ঘোষণা করেছেন। তবে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য তার বহু প্রতিশ্রুতি ও জাঁকজমকপূর্ণ পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন সত্ত্বেও প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থতার সমালোচনা উঠেছে।
গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন ২০২৫-এ বিডা প্রধান আশিক চৌধুরী বাংলাদেশকে ২০৩৫ সালের মধ্যে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তার বক্তৃতা এবং প্রেজেন্টেশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ালেও, বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সম্মেলনে ৫০টি দেশ থেকে ৪১৫ জন বিদেশি প্রতিনিধি অংশ নেন এবং ৩১০০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রস্তাবের কথা বলা হয়। তবে, এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবে রূপ নেওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
বিডা জানিয়েছে, গত নয় মাসে বাংলাদেশে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৭৫৬ মিলিয়ন ডলার নিট এফডিআই হিসেবে এসেছে। তবে, এই পরিমাণ বাংলাদেশের সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সম্মেলনে উপস্থাপিত উচ্চ রিটার্ন অন ইকুইটি (৫৬% থেকে ৮০%) এবং আকর্ষণীয় প্রেজেন্টেশন সত্ত্বেও, বিনিয়োগকারীরা জটিল নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া, নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব এবং দুর্নীতির কারণে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্মেলনের পর পর্যাপ্ত ফলোআপের অভাব এবং বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও বিচারিক সংস্কারের ধীরগতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এফডিআই আকর্ষণে ব্যর্থতার পর এখন বিডা প্রধান হালাল পণ্যের হাব গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিয়েছেন।
তিনি জানান, সরকার হালাল অর্থনীতির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে এবং হালাল উৎপাদনের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে হালাল রপ্তানিতে ৭-৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিএমসিসিআই) আয়োজিত “হালাল ইকোনমি ৩৬০: ড্রাইভিং গ্লোবাল গ্রোথ” শীর্ষক সেমিনারে আশিক বলেন, “আমরা হালাল উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছি।”
তবে, সমালোচকরা বলছেন, এই নতুন দিকে ঝুঁকে পড়ার মাধ্যমে বিডা বাংলাদেশকে একটি বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে প্রচারের মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসছে।
বিডার ব্যবসায় উন্নয়ন বিভাগের প্রধান নাহিয়ান রহমান রচি জানিয়েছেন, সম্মেলনের পর বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে, অর্থনীতিবিদ ড. সৈয়দ আখতার মাহমুদ বলেন, “আমাদের বড় বড় ইভেন্টের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় মনোযোগের অভাব রয়েছে। এটিই প্রকৃত কাজের জায়গা।”
বাংলাদেশের বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনা থাকলেও, বিডার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা এবং প্রেজেন্টেশন বাস্তবে রূপান্তরিত না হওয়ায় অনেকে হতাশা প্রকাশ করেছেন। হালাল হাব গড়ে তোলার নতুন উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিডাকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য আরও কার্যকর পদক্ষেপ এবং সংস্কারের ওপর জোর দিতে হবে।
