বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, নিকোটিন পাউচ বাংলাদেশে বৈধ পণ্য। তাই দেশে প্রথমবারের মতো নিকোটিন পাউচ উৎপাদন কারখানার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশ্বের অনেক দেশে এ পণ্য নিষিদ্ধ এবং এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
বিডার অবস্থান: বৈধ ব্যবসা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
বিডা সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক কোম্পানি ফিলিপ মরিস ৫.৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে বছরে ৫৩৬ মিলিয়ন ইউনিট নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে।
বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, “এই পণ্য আমদানি নয়, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হবে। বর্তমান আইনে এর কোনো নিষেধ নেই। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি আয় বাড়বে।”
তিনি আরও দাবি করেন, নিকোটিন পাউচ ‘হার্ম রিডাকশন’ পণ্য—যা সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর।
বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ: কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় পদক্ষেপ
নিকোটিন পাউচ বিশ্বের অনেক দেশে সম্পূর্ণ বা আংশিক নিষিদ্ধ।
- বেলজিয়াম, লাক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস: সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- ফ্রান্স: ২০২৫ সাল থেকে নিষিদ্ধ হচ্ছে।
- জার্মানি: খাদ্য পণ্য হিসেবে নিষিদ্ধ।
- কানাডা: ৪ মিলিগ্রামের বেশি নিকোটিনযুক্ত পাউচ প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি করা যায় না।
- অস্ট্রেলিয়া: শুধুমাত্র চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে বিক্রি হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলছে, যুবসমাজের নিকোটিন আসক্তি ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি রোধেই এই কঠোরতা।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: ‘নিরাপদ নয়’ এই নিকোটিন পাউচ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পণ্য টোব্যাকো-মুক্ত হলেও নিরাপদ নয়।
- একটি পাউচে ৬ মিলিগ্রাম পর্যন্ত নিকোটিন থাকে, যা সিগারেটের সমান।
- এটি মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা দেয় এবং আসক্তি বাড়ায়।
- রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
- দাঁতের মাড়ি ক্ষয়, ক্যাভিটি ও মুখে প্রি-ক্যান্সারাস লেশনের ঝুঁকি তৈরি করে।
- গর্ভবতী নারীদের জন্যও এটি ক্ষতিকর, শিশুর বিকাশে প্রভাব ফেলে।
মার্কিন স্বাস্থ্য সংস্থা সিডিসি ও এফডিএ জানিয়েছে, এটি ধূমপান ছাড়ার উপায় নয়; বরং যারা ধূমপান করেন না, তাদের নতুনভাবে আসক্ত করছে।
টোব্যাকো-মুক্ত লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন
সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে টোব্যাকো-মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন সেই লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অ্যান্টি-টোব্যাকো অ্যালায়েন্সের সমন্বয়ক সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, “এটি টোব্যাকো কোম্পানির নতুন কৌশল। সরকার জনস্বাস্থ্যের চেয়ে বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।”
বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও নিকোটিন পাউচের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের বিকল্প অনেক সেক্টর রয়েছে।
- আইটি ও সফটওয়্যার: বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি।
- ই-কমার্স: ১০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।
- অ্যাগ্রো-প্রসেসিং: ফ্রোজেন ফুড ও জুট পণ্যে বিপুল সম্ভাবনা।
- লেদার ও ফ্যাশন শিল্প: গার্মেন্টস খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
- রিনিউয়েবল এনার্জি: সোলার প্রকল্পে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সেক্টরগুলোতে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্য—উভয়েরই উন্নয়ন সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিকোটিন পাউচ কারখানা অনুমোদন অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হলেও এটি জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের উচিত স্বাস্থ্য-সচেতন, টেকসই ব্যবসায় বিনিয়োগ উৎসাহিত করা—যাতে অর্থনীতি ও জনগণের সুস্থতা দুইই সুরক্ষিত থাকে।
