কল্যাণ ফি বাড়ল সাড়ে পাঁচ হাজার, শ্রমিকের টাকার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন

কল্যাণ ফি বাড়ল সাড়ে পাঁচ হাজার, শ্রমিকের টাকার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক


বিদেশে যাওয়ার সময় কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া কল্যাণ ফি ১১ বছর পর বাড়িয়েছে সরকার। আগামী ১ অক্টোবর থেকে বিদেশগামী একজন কর্মীকে কল্যাণ ফি বাবদ দিতে হবে ৫ হাজার ৫০০ টাকা। এত দিন এই ফি ছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি কর্মীর কাছ থেকে বাড়তি ২ হাজার টাকা নেওয়া হবে। সরকারের যুক্তি, প্রবাসী কর্মীদের সেবার পরিধি বেড়েছে এবং তাঁদের সুরক্ষা ও কল্যাণ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে ফি বাড়ানো হয়েছে।

তবে কল্যাণ ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই তহবিলের অর্থ ব্যবহারের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থে মৃত কর্মীর মরদেহ দেশে আনা, পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা, শিক্ষা উপবৃত্তি ও আইনি সহায়তার মতো কার্যক্রম চলে। আবার এই তহবিলের অর্থ দিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মূলধন গঠন এবং বিদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের মতো কাজেও অর্থ ব্যয় হয়েছে। ফলে যে কর্মীর কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে এই অর্থ নেওয়া হচ্ছে, তাঁর সরাসরি কল্যাণে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে আর অন্যান্য কাজে কতটা যাচ্ছে, সেই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

 

১১ বছর পর ফি বাড়ল

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে কল্যাণ ফি ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে। ২০১৫ সালে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য এই ফি ৩ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন হার ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হবে।

মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রবাসী কর্মীদের সেবামূলক কার্যক্রমের পরিধি ও পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। কর্মীদের সুরক্ষাসহ সার্বিক কল্যাণ কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং ডলারের বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য ফি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

কল্যাণ ফির পাশাপাশি কর্মীদের বীমা বাবদ আরও ১ হাজার টাকা দিতে হয়। আগে বহির্গমন ছাড়পত্রের সঙ্গে স্মার্ট কার্ডের জন্য ফি নেওয়া হলেও বর্তমানে সেটি বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে।

 

যে সেবার জন্য এই অর্থ

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল থেকে প্রবাসী কর্মী ও তাঁদের পরিবারের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়। বিদেশে কোনো কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ দেশে আনা ও দাফনের জন্য সহায়তা দেওয়া হয়। বর্তমানে বিমানবন্দরে মরদেহ পৌঁছানোর পর দাফন ও পরিবহন বাবদ ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। নিহত কর্মীর পরিবারকে দেওয়া হয় এককালীন ৩ লাখ টাকা। অসুস্থ কর্মীদের চিকিৎসা সহায়তা, সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি এবং বিপদগ্রস্ত কর্মীদের আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।

এ ছাড়া বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন, বিদেশে থাকা কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সহায়তা এবং বিমানবন্দর ও বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা দেওয়া হয়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে ২০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ কল্যাণ তহবিলের অর্থ শ্রমিকদের কল্যাণে একেবারেই ব্যয় হয় না—এমন নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, তহবিলের মোট অর্থের কতটা সরাসরি কর্মী ও তাঁর পরিবারের জন্য ব্যয় হচ্ছে এবং কতটা অন্যান্য কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

শ্রমিকের টাকায় ব্যাংকের মূলধন

কল্যাণ তহবিলের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ , প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার সময় মোট ১০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন ছিল। এর মধ্যে ৯৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল থেকে। সরকার দিয়েছিল ৫ কোটি টাকা।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিদেশ যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া এবং বিদেশফেরত কর্মীদের স্ব-কর্মসংস্থানে সহায়তা করা। অর্থাৎ এই অর্থের ব্যবহারও প্রবাসী কর্মীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। তবে কল্যাণ তহবিলের অর্থ এখানে সরাসরি অনুদান হিসেবে নয়, একটি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিজের তথ্যেও বলা হয়েছে, ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধনের ৯৫ শতাংশ অর্থ কল্যাণ বোর্ড থেকে দেওয়া হয়েছিল।

১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশে স্কুল

কল্যাণ তহবিলের অর্থ ব্যবহারের আরেকটি বড় উদাহরণ বিদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও গ্রিসে প্রবাসী কর্মীদের সন্তানদের জন্য পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে ১০০ কোটি ২ লাখ ৬৭ হাজার ৫৫৮ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এই অর্থ দেওয়ার কথা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল থেকে।

বোর্ডের কল্যাণ তহবিল চলে প্রধানত প্রবাসী শ্রমিকদের দেওয়া টাকায়। তখন অভিবাসন খাতের গবেষক সি আর আবরার প্রশ্ন তুলেছিলেন, কল্যাণ তহবিলে অর্থ দেওয়া কর্মীদের বেশির ভাগই স্বল্প দক্ষ শ্রমিক; তাঁদের জন্য এই ব্যয়ের প্রত্যক্ষ উপকার কতটা, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে তৎকালীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সভাপতি ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছিলেন, প্রবাসী বলতে শুধু শ্রমিক বোঝায় না; সব প্রবাসীর সামগ্রিক কল্যাণে এসব কাজ করা হয়। সব কাজ থেকে শ্রমিকদের সরাসরি উপকৃত হতে হবে—এমন নয়।

এই বক্তব্যই মূল প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট করে। কল্যাণ ফি যাঁরা দেন, তাঁদের মধ্যে বড় অংশ বিদেশগামী শ্রমিক। তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে কোন ধরনের প্রকল্পকে ‘কল্যাণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়—তা কতটা স্বচ্ছ?

 

তহবিলের অর্থের উৎসও শ্রমিক

১৯৯০ সালে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ তহবিল গঠন করা হয়। পরে ২০১৮ সালের আইনের মাধ্যমে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় পরিণত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তহবিলের অর্থ আসে মূলত প্রবাসী কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া বিভিন্ন ফি থেকে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে আদায় করা কিছু ফি এবং কনস্যুলার ফির ওপর ১০ শতাংশ সারচার্জও তহবিলে জমা হয়।

ফলে এই তহবিলকে সাধারণ সরকারি রাজস্বের মতো দেখার সুযোগ কম। যে কর্মী বিদেশ যাওয়ার সময় টাকা দেন, তিনি এবং তাঁর পরিবারই এই তহবিলের প্রধান সুবিধাভোগী হওয়ার কথা—এমন প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক।

কিন্তু তহবিলের অর্থ ব্যাংকের মূলধন, বিদেশে স্কুল বা বড় প্রকল্পে ব্যয় হলে এসব খাতে অর্থ দেওয়ার যৌক্তিকতা, প্রত্যাশিত সুফল এবং বাস্তব উপকারভোগীর হিসাবও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

 

বাড়তি দুই হাজার টাকা যাবে কোথায়

নতুন সিদ্ধান্তে একজন বিদেশগামী কর্মীর ওপর কল্যাণ ফি বাবদ বাড়তি ২ হাজার টাকা ব্যয়ের চাপ পড়ছে। লাখ লাখ কর্মী প্রতিবছর বিদেশে যাওয়ায় এই বাড়তি অর্থ থেকে তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ যোগ হওয়ার কথা।

সরকার বলছে, সেবার পরিধি বাড়ার কারণেই ফি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ফি বৃদ্ধির সঙ্গে নতুন করে কোন কোন সেবা বাড়ানো হবে, কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হবে এবং কর্মীরা কী সুবিধা পাবেন—এসবের বিস্তারিত হিসাব সামনে আসেনি।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ওয়েবসাইটে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি ১ এপ্রিল ২০২৬ প্রকাশ করা হয়।

এই প্রতিবেদনের পাশাপাশি আগের বছরগুলোর হিসাব বিশ্লেষণ করলেই বোঝা সম্ভব, তহবিলের আয় কত, ব্যয় কত এবং কোন খাতে কত টাকা যাচ্ছে। বিশেষ করে কল্যাণমূলক সরাসরি সহায়তা, প্রশাসনিক ব্যয়, বিনিয়োগ, ব্যাংকে অর্থ প্রদান ও বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয়—এগুলো আলাদা করে প্রকাশ করা হলে তহবিল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

প্রশ্ন স্বচ্ছতার

বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া কল্যাণ ফি মূলত তাঁদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়। সেই অর্থে মৃত কর্মীর পরিবারকে সহায়তা, মরদেহ দেশে আনা, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা কিংবা বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা রয়েছে।

কিন্তু একই তহবিলের অর্থ যখন ব্যাংকের মূলধন কিংবা বিদেশে বড় প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়, তখন ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা, উপকারভোগীর সংখ্যা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ফলাফল—সবই প্রকাশ করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ১১ বছর পর কল্যাণ ফি যখন ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে, তখন একজন কর্মীর কাছ থেকে নেওয়া এই ৫ হাজার ৫০০ টাকার কত অংশ তাঁর নিজের বা তাঁর পরিবারের কল্যাণে ব্যয় হচ্ছে—তার হিসাব জানার অধিকারও ওই কর্মীর রয়েছে।

ফি বাড়ানোর যুক্তি হিসেবে সরকার সেবার পরিধি বাড়ার কথা বলেছে। এখন সেই বাড়তি সেবার বিপরীতে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কত কর্মী সুবিধা পাচ্ছেন এবং তহবিলে বছর শেষে কত টাকা থাকছে—এই তথ্যগুলো প্রকাশ করাই হবে তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Visited 8 times, 1 visit(s) today