নিজস্ব প্রতিবেদক
গত ছয় মাসে দেশের প্রান্তিক খামারিদের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এসময় ১০ হাজারেরও বেশি খামার বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ)।
আজ ৭ই জুলাই, সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
সংকট মোকাবিলায় ডিম মুরগির ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের টিকিয়ে রাখতে ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করার দাবি জানায় সংগঠন। সেই সঙ্গে কর্পোরেট কোম্পানির নিজস্ব উৎপাদন ও কন্ট্রাক্ট ফার্মিং সুষ্ঠু নীতিমালা এবং পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট উন্নয়ন বোর্ড গঠনে দাবি জানান উদ্যোক্তারা।
সংগঠনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, দেশের পোল্ট্রি বাজার নিয়ন্ত্রণ হয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। তারা চাইলে দাম বাড়ায়-কমায়। মুরগি বা ডিমের দাম বাড়লে সরকার হইচই করে, নানাভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু দাম কমলে, প্রান্তিক খামারিরা লোকসানে সরকার ঘুমিয়ে থাকে।
তিনি বলেন, এখন মুরগি ও ডিমের দাম কমায় সাধারণ ভোক্তা খুশি। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন, এই স্বস্তি কি আসলে স্বস্তি নাকি অস্বস্তির মূল কারণ হবে। প্রান্তিক খামারিদের পুঁজি, শ্রম ও স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। কেজিপ্রতি ব্রয়লার উৎপাদনের খরচ গড়ে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, অথচ খামার পর্যায় বিক্রি করতে হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। সোনালির কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, খামার পর্যায় বিক্রি করতে হয় ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। একটা ডিমের উৎপাদন খরচ ১০ টাকা, খামার পর্যায় বিক্রি করতে হচ্ছে ৬ থেকে ৮ টাকায়।
তিনি বলেন, দেশে প্রতিদিন ব্রয়লার, সোনালি, লেয়ার উৎপাদন ৫,২০০ টন, দিনে ডিম উৎপাদন ৪ থেকে সাড়ে ৪ কোটি পিস। এর মধ্যে প্রান্তিক খামারিরা দিনে ৩ হাজার টন মুরগি ও ৩ কোটি পিস ডিম উৎপাদন করেন। কেজিপ্রতি মুরগিতে গড়ে ৩০ টাকা করে টনপ্রতি লস ৩০ হাজার, ৩ হাজার টন মুরগিতে দিনে লস ৯ কোটি টাকা এবং ৩ কোটি ডিমে দিনে গড়ে ২ টাকা করে একদিনেই ৬ কোটি টাকা লস। ডিম ও মুরগিতে মিলে দিনে লস ১৫ কোটি টাকা। এভাবে গত ৬ মাসে ডিম ও মুরগিতে প্রান্তিক খামারিদের ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
সুমন হাওলাদার বলেন, এমন লোকসানের প্রধান কারণ কোম্পানি ও তাদের কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদিত ডিম, মুরগি এবং প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন খরচের সঙ্গে বৈষম্য থাকায় এ সুবিধা নিচ্ছে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অসাধু চক্র। খামারিরা কম দামে বিক্রি করলেও ভোক্তারা ঠিকই বেশি দামে খাচ্ছে। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন চলতে থাকলে প্রান্তিক খামারি আর থাকবে না।
দুর্ভাগ্যবশত, প্রতিদিন শত শত খামার বন্ধ হচ্ছে। গত ৬ মাসে ১০ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র-মাঝারি খামার বন্ধ হয়েছে। একটি খামার বন্ধ মানে শুধু মুরগি বা ডিমের উৎপাদন কমে যাওয়া নয়, বরং একটি পরিবার আয় হারাচ্ছে, একজন যুবক বেকার হয়ে যাচ্ছে, একটি সংসার ঋণের নিচে ডুবে যাচ্ছে। আমরা অনেক খামারিকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখেছি, কেউ কেউ এমনকি দেউলিয়া হয়ে গেছেন অনেকে এ অবস্থা আর চলতে পারে না, বলেন তিনি।
এ সময় সংবাদ সম্মেলনে বিপিএ ১০ দফা দাবি তুলে ধরে। সেগুলো হলো-
১। জাতীয় পোল্ট্রি শুমারি ও ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি।
২। সব ডিলার ও খামারি ব্যবসায়ীকে উদ্যোক্তা আইডি কার্ড দেওয়া।
৩। নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ ও নীতিনির্ধারণী সরকারি মিটিং প্রান্তিক খামারিদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ।
৪। প্রান্তিকদের জন্য সরকারি সব ধরনের নীতিগত সহায়তা ও জামানতবিহীন স্বল্প-সুদের ঋণ ব্যবস্থা।
৫। ফিড, ভ্যাকসিন ও ওষুধের দামে স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারিভাবে ফিডমিল ও হ্যাচারি স্থাপনের উদ্যোগ।
৬। আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ এবং জেলা উপজেলায় কোল্ড স্টোরের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭। স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ন্যায্য মূল্য ও বাজার সংযোগ নিশ্চিতকরণ, ড্রেসড মার্কেটে প্রবেশ করতে হবে।
৮। নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ডিম-মুরগি উৎপাদন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে হবে।
৯। বাজার ধসসহ বিভিন্ন সংকটকালীন প্রতিকূলতায় সময় প্রান্তিক খামারিদের জন্য প্রণোদনা ও ভর্তুকি ব্যবস্থা করতে হবে।
১০। সুষ্ঠু কন্ট্রাক্ট ফার্মিং নীতিমালা প্রণয়ন ও জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন।
এ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সহ সভাপতি বাপ্পি কুমার দে, সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খন্দকার, সাংগঠনিক সম্পাদক ইকবাল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক মেজবাউল হক মারুফি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাউসার আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
