নেটিজেনের কথা | বিএনপির মুক্তিযুদ্ধ-ট্রাম্প বনাম মাহফুজদের ওভার-ট্রাম্প!

নেটিজেনের কথা | বিএনপির মুক্তিযুদ্ধ-ট্রাম্প বনাম মাহফুজদের ওভার-ট্রাম্প!
শেয়ার করুন
প্রিনন ফারুক
আপাতদৃষ্টিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন(বৈবিছা)-কে মনে হচ্ছে এরা জামায়াতে ইসলামির ভিন্ন একটা ভার্সন। প্রকৃত অর্থে এরা জামাতের কোন ভার্সন নয়। এরা জামাতের থেকেও অন্তত দশ গুণ বেশি প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাৎমুখি। মুক্তিযুদ্ধকে জামাতে ইসলাম অস্বীকার করে না, তারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যাচার করে, ভিন্ন একটা বয়ান তৈরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু বৈবিছা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে, স্কিপ করে। তারা ভিত্তি ধরে ‘৪৭ কে এবং ‘২৪ কে। একাত্তরকে তারা একদম মুছে ফেলতে চায়। তাদের রাজনীতিও ধর্মভিত্তিক এবং সেটা জামাতের থেকেও ব্যাপক। জামাতের ধর্ম দিয়ে দেশের সামান্য একটা অংশকে পাশে পাওয়া যাবে, কিন্তু বৈবিছা’র ধর্ম দিয়ে দেশের অধিকাংশকেই পাশে পাওয়া যাবে।
এখন প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপিও কেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হলো? জোঁকের মুখে লবন যেমন, জামাতের সামনে মুক্তিযুদ্ধও তেমন। জামাত ও বৈবিছা’র যে মধুচন্দ্রিমা চলছে তা পুরো জাতি দেখছে। লীগ ও দল মিলে এ সত্য প্রতিষ্ঠিতও করে ফেলছে, যা বৈবিছা’র জন্য বিরাট বড় পরাজয়ও। বিএনপি ও বৈবিছা, দু’পক্ষই জানে, জামাতের ইসলামির রাষ্ট্রীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি যা-ই থাকুক, জনভিত্তি একদমই নেই। ৩০০ আসনের মধ্যে একটা আসনেও জয়লাভ করার মতো ভোট তাদের নেই। বড়জোর ২০/২২ টা আসনে দ্বিতীয় ও শতাধিক আসনে তৃতীয় হতে পারবে। বিএনপি প্রাণপণে চাইছে বৈবিছাকে জামাতি প্রমাণ করতে। জামাত ও বৈবিছা যেহেতু মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সেহেতু বিএনপি খেলছে মুক্তিযুদ্ধ-ট্রাম্প। বিএনপি একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে দিচ্ছে জামাত ও বৈবিছাকে। বৈবিছা অবস্থা বেগতিক দেখে ঐ কোনঠাসা অবস্থা থেকে, জামাত ট্যাগ থেকে বের হয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভণ্ডামি দিয়ে বিএনপিকে ওভার-ট্রাম্প করছে।
একদম পানির মতো সহজ সরল একটা সমীকরণ, তা হলো, বৈবিছা তো কয়েক মাস দেশ শাসন করার জন্য আসেনি! এখন যেভাবে ক্ষমতায় আছে এভাবেও তো বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা সম্ভব নয়। তাহলে? সহজ হিসাব, তাদের একটা জনভিত্তি লাগবে, একটি রাজনৈতিক দল লাগবে। আন্দোলনের সহযোদ্ধা তো হাসিনাবিরোধী সব পক্ষই, তাদের সবারই নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় আছে। কিন্তু বৈবিছা’র রাজনৈতিক পরিচয় কী?
বৈবিছা সে রাজনৈতিক পরিচয় সুসংহত করার লক্ষ্যেই কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। ধরে নিই, দেশের মানুষ মূলত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি। এর বাইরে আছে জাপা, বাম, ইসলামি নানা গোষ্ঠী ও সুশীল(!) সমাজ। এদের মধ্যে বৈবিছার টার্গেট কারা? কাদের দুর্গে হানা দেবে বৈবিছা?
এদের মধ্যে সুশীল(!) ও বামদের দখল মোটামুটি নিয়ে নিয়েছে বৈবিছা। এরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ায় বৈবিছাকে শক্তি দেবে ঠিকই, কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে এরা জিরো। এদের ভোটও নেই, আবার অনেকেই ভোট দিতেও যায় না। রংপুরের বাইরের জাপা ও ইসলামিগোষ্ঠীগুলো মূলত বিএনপিপন্থি। বৈবিছাকে মূলত হানা দিতে হবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামাতের দূর্গেই।
ফলাফল? জামাতের দুর্গে হানা দিয়ে কোন লাভ নেই। জামাত থেকে একটা সিঙ্গেল ভোটও এরা নিতে পারবে না। আওয়ামী লীগ? লীগ ও বৈবিছা প্রকাশ্য শত্রু। প্রকৃত আওয়ামী লীগের একটা ভোটের দখলও এরা নিতে পারবে না। তবে আওয়ামী লীগের একটা সুবিধাবাদী গ্রুপ আছে। এরা প্রাণপণে চাইবে বৈবিছার সাথে মিশে যেতে। কিন্তু বৈবিছা এদের নিতে চাইবে না, বিতর্কের ভয়ে। বাকি থাকে বিএনপি। মূলত খেলাটা এখানেই। দখল আর নিজেদের দূর্গ রক্ষার সংগ্রাম চলবে বৈবিছা ও বিএনপির মধ্যেই।
বৈবিছা ও বিএনপি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাসিনাবিরোধী অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছে। তাদের আছে মানসিক ঐক্য। তৃণমূল বিএনপি এ আমলেই ভোগ করছে ক্ষমতা। বিএনপি’র সাংগঠনিক অবস্থাও খুবই লেজেগোবরে। বিএনপির সুবিধাবাদী গোষ্ঠীটাকে কাছে টানবে বৈবিছা। তাদেরকে পুরষ্কৃতও করবে। যেমন ধরুন, স্থানীয় সরকার বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন এখন বিএনপি’র দুর্বল আদর্শের লোকগুলোকে ডেকে ডেকে এসব দায়িত্ব দিয়ে দেবে। ধরুন, ভিজিএফ কার্ড বাতিল করে দেওয়া হলো। প্রশাসন কিছু লোককে দায়িত্ব দিলো, তোমরা আবার তালিকা বানাও, ভিজিএফ কার্ড বিতরণ করো। বৈবিছার টার্গেটের এসব লোককে স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হবে।
এটা একটা সামান্য উদাহরণ মাত্র। এরকম অজস্র পলিসি আছে, যার প্রয়োগ শুরু করা হয়েছে। বৈবিছা রাষ্ট্রযন্ত্রের পুরোটা ব্যবহার করছে একটা কিংস পার্টি গঠন করার জন্য। রাষ্ট্রের প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা একদম আদাজল খেয়েই মাঠে আছে। জিয়া যেভাবে বিএনপি বানিয়েছিলো, বৈবিছা তার দাঁড়ি-কমাসহ সবকিছুই অনুসরণ করছে। এটা বিএনপির জন্য মারাত্মক হুমকি। নির্বাচনে কিংস পার্টি যদি ১০টা ভোটও পায়, তার মধ্যে ৭টাই হবে বিএনপি থেকে ভাগিয়ে আনা। নির্বাচন একদিন পিছিয়ে গেলে বিএনপিও এক কদম করে পিছিয়ে যাবে।
দ্রুত নির্বাচন বিএনপি ও লীগ দুপক্ষের জন্যই খুব প্রয়োজন। বিএনপি’র প্রয়োজন দল অক্ষত রাখার জন্য, আওয়ামী লীগের প্রয়োজন রাজনীতিতে পুনর্বাসনের জন্য। স্বার্থ দু’পক্ষেরই। এজন্যই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র হাইকমান্ডের কণ্ঠস্বর চিনতে সমস্যা হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন একই কণ্ঠস্বর।
প্রতিদিনই রাজনীতির রঙ বদলাবে। ক্লাইমেক্স এন্টি ক্লাইমেক্সে জমজমাট হবে রাজনীতির পরিবেশ। আন্তর্জাতিক প্রভাববলয়ের কথা ভাবছেন তো!? ইউরোপ আমেরিকা কখনোই একদম জনবিচ্ছিন্ন অংশের পক্ষ এদেশে কখনোই নেয় না। আপনার মাজায় জোর থাকতে হবে, তখনই তারা আপনাকে উস্কে দেবে, সমর্থন দেবে। আপনার মাজায় জোর না থাকলে আপনাকে তারা কাঁধে নিয়ে বেড়াবে না, ছুঁড়ে ফেলে দেবে।
বিএনপি সমর্থকদের হানিমুন পিরিয়ড দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। এ সরকার তার শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার আগে নির্বাচন দেবে না ভুলেও। নির্বাচন দ্রুত আদায় করার জন্যও আন্তর্জাতিক চাপ থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক চাপ তখনই আসবে যখন জনগণ নির্বাচন চাইবে। আর যারা ভাবছেন আওয়ামী লীগ শেষ হয়ে গেছে, তারাও বোকার স্বর্গে বাস করছেন। ১৫ বছর আওয়ামী লীগের যে সেটকে ক্ষমতায় দেখেছেন, এখন মাঠে দেখবেন আরেক সেট আওয়ামী লীগ, যে আওয়ামী লীগ ১৫ বছর হালুয়া-রুটির ভাগ পায়নি, এমনকি ভবিষ্যতেও পাবে না।
এরশাদ জমানার যে রাজনৈতিক বাস্তবতা দেখেছেন, এবার সেই রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রায় অভিন্ন একটা ভার্সনই দেখা যাবে অদূর ভবিষ্যতে।
Visited 97 times, 1 visit(s) today