Preset71.
“জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বদর দস্যুদের মুখোশ উন্মোচন করুন”- প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হানকে উল্লেখ করে ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭১, দৈনিক ইত্তেফাক একটি সংবাদ প্রকাশ করে। আগের দিন প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে জহির এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন- শুধু আলবদর নয়, বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত। এ বিষয়ে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য তিনি সরকারকে পরামর্শ দেন। এছাড়া দাবী করেন- সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের একটি পুর্নাঙ্গ তালিকা তাঁর কাছে রয়েছে।
১৮ ডিসেম্বর জহির রায়হান কলকাতা থেকে ফিরে এসে জানতে পারেন, তাঁর সহোদর প্রখ্যাত লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকেও আরো বহু বুদ্ধিজীবিদের সাথে অপহরন করেছে আলবদররা। রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে অনেকের বিক্ষত দেহ পাওয়া গেলেও শহীদুল্লাহ কায়সারের দেহ পাওয়া যায়নি। ভাইয়ের খোঁজ নেয়ার পাশাপাশি জহির কমিটি করে আলবদরদের অবস্থান জানার চেষ্টা করেছিলেন। এক সম্ভাব্য আলবদরকে ধরে নিয়ে এসে শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সারের সামনে হাজিরও করেন। পান্না চেহারা দেখামাত্রই চিনতে পারেন, এই লোকটি তাঁর স্বামীর অপহরনে ছিল। খালেক মজুমদার। খালেক জানায়- সে শহীদুল্লাহকে হত্যা করেনি, ধরে নিয়ে আলবদরের অপারেশন-ইনচার্জ চৌধুরী মাঈনুদ্দিনের হাতে তুলে দিয়েছে। খালেককে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। পলাতক আলবদরদের ধরা এবং অপহৃত ভাইকে খুঁজে বের করার জন্য তৎপর থাকেন জহির রায়হান।
ঢাকার উপকন্ঠ মিরপুর তখনো শত্রুমুক্ত হয়নি। পাকিস্তান আর্মি আত্মসমর্পণ করলেও প্রায় ২০ হাজার সশস্ত্র বিহারী তখনো মিরপুর দখল রেখেছে, এদের সাথে আছে আত্মসমর্পণ না করা একদল পাকিস্তানী সৈনিক এবং সারাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে আসা আলবদর ও রাজাকাররা। ভারী অস্ত্রশস্ত্র সহ মিরপুর তখন এক ক্যান্টনমেন্ট। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু ফিরে এসে আহ্বান জানানোর পর মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপ অস্ত্র জমা দেয়া শুরু করে। কিন্তু কাদেরিয়া বাহিনী প্রধান কাদের সিদ্দিকী শর্ত দেন- বিহারীরা অস্ত্র সমর্পণ না করলে তিনি অস্ত্র জমা দেবেন না।
এই অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানী ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল শফিউল্লাহ বৈঠক করেন। সিদ্ধান্ত হয়, অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে। ১৬ ডিসেম্বরের পর মিরপুরের নিরাপত্তায় থাকা ভারতীয় ১০ বিহার রেজিমেন্টের সাথে যোগাযোগ করলে তারা আশ্বস্ত করে- অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে বিহারীরা কোন বাধা দেবেনা, স্বেচ্ছায় অস্ত্র সমর্পণ করবে।
এই আশ্বাসের প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয়- অভিযানে নেতৃত্ব দিবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউল হক লোদীর নেতৃত্বে ৩০০ পুলিশ, সহায়তা করবে ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদের নেতৃত্বে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক কোম্পানী সৈনিক। সার্বিক দায়িত্বে থাকবেন দ্বিতীয় বেঙ্গলের কমাণ্ডার মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী। অপারেশনের তারিখ ও সময় নির্ধারিত হয় ৩০ জানুয়ারী সকাল ৭টা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৯ জানুয়ারী বিকেলে সৈনিকেরা মিরপুর যান, ভারতীয় রেজিমেন্ট তাঁদেরকে পজিশন বুঝিয়ে দিয়ে হেড কোয়ার্টারে ফিরে যায়।
৩০ জানুয়ারী ১৯৭২। সকাল ৭টা। অভিযান বহর প্রস্তুত। এসময় দুটি গাড়িতে এসে উপস্থিত হন জহির রায়হান সহ শহীদুল্লাহ কায়সার পরিবারের কয়েকজন। ভোরবেলা আসগর আলি মাস্তানা নামে ঢাকা চলচ্চিত্রের এক বিহারী অভিনেতা ফোন করে জানায়, শহীদুল্লাহ কায়সার সহ কয়েকজন বুদ্ধিজীবি এখানে বন্দী আছেন। বেসামরিক ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে কমাণ্ডাররা খুবই বিরক্ত হন। জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত শুধু জহির রায়হানকে থাকার অনুমতি দেয়া হয়, বাকী সবাইকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ল্যান্স নায়েক আমির হোসেন ও সিপাহি আকরামকে নিয়োজিত করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনাবাহিনী পজিশন নেয় যেনো কেউ অভিযানের সময় পালাতে না পারে। অস্ত্র তল্লাশীর মুল কাজ শুরু করার জন্য পুলিশও প্রস্তুত হয়। মাইকে ঘোষনা শুরু হয়- প্রত্যেকে যেনো রাস্তায় এনে অস্ত্র জমা দিয়ে যায়। সব ঠিকঠাক করে ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদকে ব্রিফিং দিয়ে মেজর মইন ফিরে যান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, দ্বিতীয় বেঙ্গলের অস্থায়ী হেডকোয়ার্টারে। প্রথম কিছুক্ষন সবকিছু শান্তিপূর্ণভাবে চলে।
সকাল এগারোটার দিকে হঠাৎ পাগলা ঘন্টির আওয়াজ শুনা যায়। সাথে সাথে সরুগলির দুপাশের বাড়িগুলোর ভেতর ও ছাদ থেকে বৃষ্টির মতো গুলীবর্ষন শুরু হয়। ভারী মেশিনগানের গুলীর কাভারে বিপুল সংখ্যক বিহারী অস্ত্র হাতে বের হয়ে এসে আক্রমন শুরু করে। বাংলাদেশ বাহিনী হঠাৎ আক্রমন সামলে পাল্টা আক্রমন শুরু করার আগেই ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। সুবেদার মোখলেছুর রহমান ও ল্যান্স নায়েক নুরুল ইসলাম ঝিলপাড়ের অবস্থান থেকে এলএমজি ও এসএমজি ফায়ার করতে করতে পানির ট্যাংকের কাছে চলে আসেন। সেখানে গিয়ে দেখেন তাঁদের কেউ জীবিত নেই। দেয়ালের পাশে জহির রায়হান এবং রাস্তার অপর পাশে পুলিশের দলটি লুটিয়ে আছে।
উপায় না দেখে আগের অবস্থানে ফিরে আসতে গিয়ে শহীদ হন নুরুল ইসলাম। মোখলেছুর রহমান এবং বেঁচে থাকা অন্যরা তখনো যুদ্ধ চালিয়ে যান। বেতার যন্ত্রগুলি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ব্যাটেলিয়ন হেডকোয়ার্টারে সময়মতো সংবাদও পৌঁছানো যায়নি। একসময় পুরো এলাকা বিহারীদের নিয়ন্ত্রনে চলে যায়। তারা তাদের আহত নিহতদের সরিয়ে নেয় এবং বাঙ্গালী আহতদের কুপিয়ে হত্যা করে লাশগুলো ফেলে দেয় কুয়া, ডোবা ও ঝিলে। বিকেলের মধ্যে বেঙ্গল রেজিমেন্টের হেডকোয়ার্টারে বিপর্যয়ের সংবাদ পৌঁছে যায়। সন্ধ্যার পর শুরু হয় সেনাবাহিনীর মর্টার হামলা। সারারাত সেনাবাহিনীর সঙ্গে খণ্ড যুদ্ধ চলে বিহারিদের।
৩১ জানুয়ারি ভোরে মেজর মইন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ভারি অস্ত্রসহ দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের পুরো ব্যাটেলিয়ন মিরপুরে নিয়ে আসেন। কর্নেল শফিউল্লাহ এবং কর্নেল খালেদ মোশাররফও মিরপুরে আসেন। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে মিরপুরের ১,২ ও ৬ নম্বর সেকশন শত্রুমুক্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলকে দেওয়া হয় ১০, ১১ ও ১২ নম্বর সেকশনের দায়িত্ব। পূর্নাঙ্গ কারফিউ জারি করে শুরু হয় অলআউট কম্বিং অপারেশন। টানা ১০ দিন তল্লাশির পর শেষ জব্দ করা হয় ১১ ট্রাক অস্ত্র। বিহারীদের প্রধান আখতার গুণ্ডা পালিয়ে পাকিস্তান চলে যেতে সক্ষম হয়।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুরে শহীদ হয়েছিলেন প্রথম ওয়ারকোর্সে কমিশন পাওয়া সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট সেলিম কামরুল হাসানসহ ৪১ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউল হক লোদীসহ শতাধিক পুলিশ সদস্য এবং জহির রায়হান- লেখক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা। ৪-৫ জন ছাড়া দেড় শতাধিক শহীদের কারোরই লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। শহীদ জহির রায়হানেরও নয়।
সুত্রঃ
১। দৈনিক ইত্তেফাক। ২৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১।
২। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া শহীদ জায়া পান্না কায়সারের সাক্ষ্য
৩। ল্যান্স নায়েক আমির হোসেনের সাক্ষাৎকার। ‘ নিখোঁজ নন,গুলীতে শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান’। জুলফিকার আলী মানিকের প্রতিবেদন। দৈনিক ভোরের কাগজ, ১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯
৪। সুবেদার মোখলেছুর রহমানের সাক্ষাৎকার। জল্লাদখানা গণহত্যা, সত্যজিত রায় মজুমদার। জাগতিক প্রকাশন
৫। পিতার অস্থির সন্ধানে/ অনল রায়হান( শহীদ জহির রায়হানের পুত্র)। সাপ্তাহিক ২০০০, ১৩ আগস্ট বর্ষ ২ সংখ্যা ১৪
