জহির রায়হানের অন্তর্ধান রহস্য

জহির রায়হানের অন্তর্ধান রহস্য
শেয়ার করুন

❐ রেদোয়ান ইবনে সাইফুল


মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ খান, যিনি জহির রায়হান নামেই সমধিক পরিচিত, ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাহিত্যিক এবং সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁর নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ এবং ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ এর মতো প্রামাণ্যচিত্রগুলো বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের গণহত্যার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছিল, যা আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া, ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল এবং এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি অসাধারণ উপন্যাস ও ছোটগল্প রচনা করেছিলেন।

স্বাধীনতার মাত্র দেড় মাস পর, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হন। তাঁর এই অন্তর্ধান বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রাথমিকভাবে তাঁকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবেই গণ্য করা হয়েছিল এবং তাঁর সন্ধান চেয়ে পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হতে থাকে। তবে, পরবর্তীতে প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা যায় যে তিনি আসলে গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। তাঁর অন্তর্ধান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা তত্ত্ব ও গুজব ছড়িয়েছে, যা আজও বিতর্কের জন্ম দেয় এবং এই ঘটনার প্রকৃত সত্য উন্মোচনকে আরও জটিল করে তোলে।

জহির রায়হানের পুত্র অনল রায়হানের লেখা ঘটনার বিবরণ পড়ুন এখানে

দীর্ঘকাল ধরে জহির রায়হানের অন্তর্ধানকে কেবল ‘নিখোঁজ’ হিসেবে দেখা হলেও, ১৯৯৯ সালে মিরপুরে একটি বধ্যভূমি আবিষ্কার এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের পর এই ধারণায় মৌলিক পরিবর্তন আসে। এটি কেবল একটি তথ্যের পরিবর্তন ছিল না, বরং ঘটনার প্রকৃতি এবং এর পেছনের সত্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে একটি গভীরতর পরিবর্তন নির্দেশ করে। ‘নিখোঁজ’ শব্দটিতে একটি অনিশ্চয়তা, একটি ক্ষীণ আশার রেশ থাকে, যা প্রায়শই তদন্তের অভাব এবং রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। কিন্তু যখন নায়েক আমির হোসেনের মতো প্রত্যক্ষদর্শীরা জহির রায়হানকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখার কথা জানান এবং বধ্যভূমি আবিষ্কৃত হয় , তখন ‘নিহত’ শব্দটি ঘটনার চূড়ান্ততা নির্দেশ করে। এই পরিবর্তন জহির রায়হানের ভাগ্যে কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে একটি দৃঢ় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে, যদিও হত্যাকারী কারা ছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়ে যায়। এই নতুন তথ্য ঐতিহাসিক গবেষণার জন্য নতুন পথ খুলে দেয় এবং পূর্বের অনুমানগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে।

অন্তর্ধানের প্রেক্ষাপটঃ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ও মিরপুর অভিযান

১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাস ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এক অস্থির সময়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। চোরাচালান, সশস্ত্র ডাকাতি এবং নানাবিধ অপরাধ ঠেকাতে তৎকালীন সরকার ১৯৭২ সালের ৭ মার্চ জাতীয় রক্ষী বাহিনী গঠন করে। এই সময়ে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বামপন্থী বিদ্রোহ চলছিল, যা শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অস্থির পরিবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়েছিল।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার সময় মিরপুর এলাকা ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত মিরপুর ছিল অবরুদ্ধ এবং পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনী ও অবাঙালি রাজাকাররা সেখানে দুর্ভেদ্য ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। মিরপুরকে মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি মুক্ত হয়। ৩০ জানুয়ারি, জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার দিন, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে অবস্থানরত বিহারী ও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে তীব্র গুলিবর্ষণ ঘটে।

এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই জহির রায়হান এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাত দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর ঢাকাতে ফিরেই তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান এবং ঘাতকদের ধরার জন্য ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি’ গঠন করেন। এই কমিটির অনুসন্ধানে গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী গণহত্যার নির্দেশদাতা, বাস্তবায়নকারী এবং এর সঙ্গে জড়িত এদেশীয় আলবদর ও রাজাকারদের পরিচয়, অসংখ্য গোপন তথ্য ও ডকুমেন্টস বেরিয়ে এসেছিল। জহির রায়হান এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, “আমাদের কাছে, এমন অনেক তথ্য ও প্রমাণ আছে যা প্রকাশ করলে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে। সময় বুঝে আমি এক এক করে সব প্রকাশ করব”।

জহির রায়হানের বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটির কাজ এবং তাঁর হাতে আসা সংবেদনশীল তথ্য তাঁর অন্তর্ধানের একটি সম্ভাব্য মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এই তদন্ত শুরু করার পরপরই ঘটেছিল। এই ধারাবাহিকতা একটি শক্তিশালী কার্যকারণ সম্পর্ক নির্দেশ করে। যদি জহির রায়হানের হাতে সত্যিই এমন তথ্য থাকত যা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মুখোশ উন্মোচন করতে পারত, তবে তাঁর অন্তর্ধান একটি কাকতালীয় ঘটনা নাও হতে পারে। বরং, এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা গুমের ইঙ্গিত দেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল সেই তথ্য প্রকাশ বন্ধ করা।

জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামীও এই বিষয়টি উল্লেখ করে প্রশ্ন তুলেছিলেন কেন এই তদন্ত বন্ধ হলো এবং জহির রায়হানকে কেন উধাও করা হলো। এই প্রশ্নগুলো ইঙ্গিত দেয় যে তাঁর মৃত্যু কেবল মিরপুরের সামরিক সংঘাতের ফল ছিল না, বরং এর পেছনে গভীরতর রাজনৈতিক বা স্বার্থান্বেষী উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

৩০শে জানুয়ারি, ১৯৭২: মিরপুরের পথে এক ট্র্যাজিক যাত্রা

মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ ও বধ্যভূমির সন্ধানঃ

জহির রায়হানের মিরপুরে যাওয়ার মূল কারণ ছিল তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্ধান। শহীদুল্লাহ কায়সার মিরপুরের ১২ নম্বরে একটি জায়গায় বন্দি আছেন এমন খবর পেয়ে জহির রায়হান সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এই যাত্রার অনুঘটক ছিল “রফিক” নামের এক অজ্ঞাত ব্যক্তির টেলিফোন কল। ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি একটি সাংবাদিক সম্মেলনের পাঁচদিন পর, ৩০ জানুয়ারি সকালে রফিক নামের এক ব্যক্তি জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায় ফোন করেন। রফিক ছিলেন জহিরের পূর্ব পরিচিত, যিনি ইউসিসে চাকরি করতেন। ফোনে জহিরকে বলা হয় যে তাঁর বড়দা মিরপুর ১২ নম্বরে বন্দি আছেন এবং একমাত্র তিনি গেলেই তাঁকে বাঁচাতে পারবেন। এই ফোন পেয়ে জহির রায়হান দু’টো গাড়ি নিয়ে মিরপুরের উদ্দেশে রওনা দেন, তাঁর সাথে ছিলেন ছোট ভাই জাকারিয়া হাবিব। জহির রায়হানকে পুলিশ স্টেশনে ফোন কলটি ট্রেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান এবং এরপর তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে মিরপুরকে পাকহানাদার মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ চলছিল। এটি ছিল একটি অসম ও অতর্কিত যুদ্ধ, যেখানে ৪২ জন সেনাসদস্য নিহত হন। ঐদিন সকালে অবাঙালিদের অতর্কিত হামলায় ৪২ জন সেনাসদস্য নিহত হন। ক্যাপ্টেন মোর্শেদ ও নায়েক আমিরসহ কয়েকজন আহত হন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন যে, একজন সাংবাদিককে (জহির রায়হান) ৬-৭ জন অবাঙালি হাত-ঘাড়-কোমর ধরে টেনে নিয়ে যায় পানির ট্যাংকের পশ্চিম দিকে। ১৯৯৯ সালে নায়েক আমির হোসেনের জবানবন্দি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে জহির রায়হান সেই মিরপুর যুদ্ধেই মারা গিয়েছিলেন। তিনি জহির রায়হানকে একজন ‘সাংবাদিক’ হিসেবে সনাক্ত করেছিলেন, যিনি সেই পরিচয়েই সেখানে গিয়েছিলেন।

পড়ুন: যেভাবে হারিয়ে গিয়েছিলেন জহির রায়হান : ড. নাদির জুনাইদ

রফিকের ফোন কলটি জহির রায়হানের মিরপুরে যাওয়ার মূল অনুঘটক ছিল। “একমাত্র আপনি গেলেই তাকে বাঁচাতে পারবেন” – এই বাক্যটি জহির রায়হানকে ব্যক্তিগতভাবে মিরপুরে যাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। মিরপুর তখনো পাকিস্তানি সমর্থক বিহারীদের নিয়ন্ত্রণে একটি বিপজ্জনক এলাকা ছিল। যদি রফিকের উদ্দেশ্য কেবল তথ্য জানানো হতো, তবে তিনি জহিরকে পুলিশের মাধ্যমে বা অন্য কোনো নিরাপদ উপায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিতে পারতেন। এর পরিবর্তে, তিনি জহিরকে সরাসরি বিপদজনক স্থানে যেতে প্ররোচিত করেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে রফিকের কলটি একটি সুপরিকল্পিত ফাঁদ হতে পারে, যার উদ্দেশ্য ছিল জহির রায়হানকে মিরপুরের সংঘাতে টেনে নিয়ে যাওয়া, যেখানে তাঁর মৃত্যু বা গুমের সম্ভাবনা ছিল। এই ফাঁদের নেপথ্যে কারা ছিল, তা একটি গভীরতর প্রশ্ন যা আজও অমীমাংসিত।

জহির রায়হানের অন্তর্ধান রহস্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৯৯ সালে। এই বছরের জুলাই মাসে মিরপুর ১২ নং সেকশনের মুসলিম বাজারের নূরী মসজিদের নির্মাণকাজের জন্য খননকালে মানুষের দেহাবশেষ, গুলিবিদ্ধ হাড়, করোটি আবিষ্কৃত হয়। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন যে এটি ১৯৭১ সালের একটি বধ্যভূমি ছিল। এই বধ্যভূমি আবিষ্কার ৩০ জানুয়ারির ঘটনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে এবং জহির রায়হানের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করে।

জহির রায়হানের ছেলে অনল রায়হান পিতার অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে লিখেছেন অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদন ‘পিতার অস্থির সন্ধানে’। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘সেখানে উপস্থিত ভারতীয় ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অফিসারেরা সিভিলিয়ান দেখে খুবই বিরক্ত হন। বেসামরিক লোকদের ওই এলাকায় ঢোকার অনুমতি ছিল না। সবাইকে চলে যেতে বলা হলো। শেষ পর্যন্ত জহির রায়হান একা থেকে যাওয়ার অনুমতি পান। শাহরিয়ার কবির সহ বাকি সবাই ফিরে আসেন। জহির রায়হানের গাড়িটি রেখে আসা হয়। ওই গাড়িটি একদিন পর রহস্যজনকভাবে পাওয়া যায় রমনা পার্কের সামনে।

পড়ুন: জহির রায়হানের শেষ দিনগুলো

মিরপুরে চালানো সেনা অভিযানে একমাত্র বেসামরিক ব্যক্তি ছিলেন জহির রায়হান। জহির রায়হানকে বেশ কয়েকজন চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। এর মধ্যে একজন ছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন ১২ নম্বর প্লাটুন কমান্ডার মোখলেছুর রহমান। ৩০ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত তিনি জহির রায়হানকে চিনতেন না।

জহির রায়হান আসার পর ১২ নম্বর পানির ট্যাংকের সামনে মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে জহির রায়হানের পরিচয় করিয়ে দেন অভিযানের কমান্ডার কর্নেল মইনুল হোসেন চৌধুরী। কর্নেল মইনুল এ সময় জহির রায়হানের সঙ্গে দুজন সেনাসদস্যকে রাখার কথা বলেছিলেন। মোখলেছুর রহমান এরপর সিপাহী আকরাম এবং সিপাহী আমির হোসেনকে তার সঙ্গে থাকতে বলেন। মোখলেসুর রহমান এরপর তার বাহিনী নিয়ে চলে যান পূর্ব বিলের দিকে।

যুদ্ধের ২৮ বছর পর, ১৯৯৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেদিনের আহত নায়েক আমির হোসেনের সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি স্বচক্ষে জহির রায়হানকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখেছিলেন এবং জহির রায়হান যে পোশাক পরে বেরিয়েছিলেন, তার বর্ণনা আমির হোসেনের দেয়া বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। দৈনিক ভোরের কাগজ ১৯৯৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘নিখোঁজ নন, গুলিতে নিহত হয়েছিলেন জহির রায়হান’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা আমির হোসেনের জবানবন্দির উপর ভিত্তি করে ছিল।

সেখানে জুলফিকার আলী মানিক লিখেছেন, ‘জহির রায়হানকে এই সৈনিক (আমির হোসেন) নামে চিনতেন না। তবে তাদের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা (মোখলেসুর রহমান) ঘটনাস্থলে জহির রায়হানকে দেখিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন একজন সাংবাদিক হিসেবে। সেদিন জহির রায়হানের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে ছিল তার অবস্থান। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল ওই সাংবাদিক সহ অন্যদের পাহারায় থাকা। ইউনিফর্ম পরিহিত সেনা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বাইরে একমাত্র সাংবাদিক জহির রায়হানই ছিলেন সাদা পোশাকে। আমির হোসেন ঘটনাস্থলে প্রথম তাকে দেখেন সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে……..।’

আমির হোসেন সেদিনকার স্মৃতি সম্পর্কে বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রথম সাংবাদিক সাহেবকে দেখি। পানির ট্যাংকের পাশে একটি ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে পুলিশের দুজন অফিসারের সঙ্গে তিনি কোথা বলছিলেন। তাদের পাশে ‘শ খানেক পুলিশ সদস্য ছিল। আনুমানিক ১১টায় ঢং ঢং করে কয়েকটা পাগলা ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পাই। এর পরপরই দক্ষিণ দিক থেকে গুলির শব্দ শুনি। সঙ্গে সঙ্গে আমার বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি পুলিশের অনেক সদস্য মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। সেখানেই একটি ইটের স্তূপের পেছনে আমি অবস্থান নিই। তাকিয়ে দেখি পুলিশের পাশাপাশি সাংবাদিক সাহেবও যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন তার কাছেই পানির ট্যাংকের দেয়ালের পাশে তার দেহ পড়ে আছে। মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ার ভঙ্গিতে দেয়ালের ওপর পড়েছিলেন তিনি। সাংবাদিক সাহেবের জামার বড়ো অংশ জুড়ে রক্তের দাগ দেখতে পাই। এর আগেই উত্তর দিক থেকেও বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু হয়।’

গোলাগুলি হতে পারে এমন কোনো ধারণাই ছিল না আমির হোসেনের। বিহারীদের এই গোলাগুলির নেতৃত্ব দিয়েছিল মিরপুরের কসাই আখতার গুন্ডা। আশপাশে থাকা টিনের ঝুপড়ির ফাঁক দিয়ে গুলি চালিয়েছিল বিহারীরা।

বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ এবং সবাইকে মাটিতে পড়তে দেখে আমির হোসেন বুঝতে পারেন পরিস্থিতি ভয়াবহ। তাই তিনি কিছুটা আড়ালে সরে হাতে থাকা এলএমজি তাক করেছিলেন। গুলিতে পুলিশ সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর গুলি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শতাধিক বিহারী নানান দেশীয় অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে দক্ষিণ দিক থেকে ছুটে আসতে থাকে। তারা উর্দুতে গালিগালাজ করছিল এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে চিৎকার করছিল। যেসব পুলিশ সদস্য আহত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল তারা তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো শুরু করে। এসময় পড়ে থাকা সাংবাদিককে ৬/৭ জন বিহারী হাত ঘাড় ও কোমর ধরে টেনে নিয়ে যায় পানির ট্যাংকের পশ্চিম দিকে। আমির হোসেন কোনক্রমে সেদিন ওখান থেকে পালিয়ে ফিরতে পেরেছিলেন।

হেলাল মোর্শেদ, যিনি মিরপুর যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তিনিও জহির রায়হান যে মিরপুর যুদ্ধেই মারা গিয়েছিলেন সে বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত ছিলেন। তিনি এ কথা জহির রায়হানের স্ত্রী সুচন্দাকে জানিয়েছিলেন। জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীও উল্লেখ করেন যে তাদের প্রাথমিক তদন্তে সৈন্যদের সঙ্গে একজন বাঙালি বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার তথ্য বেরিয়ে আসে এবং ঘটনা বিশ্লেষণে বোঝা যায় যে তিনিই ছিলেন জহির রায়হান।

একই দিন জহির রায়হানের সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছিলেন মিরপুরের অ্যাডিশনাল এসপি জিয়াউল হক লোদী।

১২ নং প্লাটুনের কমান্ডার মোখলেসুর রহমান তার স্মৃতিতে বলেছিলেন, ‘সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিহারীরা পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে একযোগে গুলিবর্ষণ শুরু করে। বিহারীদের আক্রমণের খবর শুনেই দ্রুত দল নিয়ে ১২ নম্বর কালাপানি ট্যাংকের সামনে আসেন তিনি। তখন তিনি পানির ট্যাংকের সামনে জহির রায়হানের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান। এটি ছিল সামনের দেয়ালে। দেয়ালের উল্টো দিকে ছিল মিরপুরের এডিশনাল এসপি জিয়াউল হক খান লোদী, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর শতাধিক অফিসার ও সেনাদের লাশ। এরপর তারা দেখেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বিহারীরা তাদের দেখতে পেয়ে আবার গুলিবর্ষণ শুরু করে।

এরপর আর জহির রায়হানের লাশের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আমির হোসেন যেহেতু বলেছেন বিহারীরা তাকে পানির ট্যাংকের পশ্চিম দিকে টেনে নিয়ে গেছে সুতরাং অনেকে মনে করেন জহির রায়হানের লাশ মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের নূরী মসজিদ সংলগ্ন কুয়াতেই ফেলে দেওয়া হয়। এই পরিত্যক্ত কুয়ার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল দীর্ঘ ২৮ বছর পরে ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে। ২৭ জুলাইয়ের ঘটনা সেটি।

১২ নম্বর সেকশনের নূরী মসজিদ সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় চলছিলো মসজিদ সম্প্রসারণের কাজ। নতুন পিলার তৈরি করার সময় মাটির নিচে একটি পরিত্যক্ত কুয়ার সন্ধান পান নির্মাণ শ্রমিকেরা। কুয়ার মুখটি ছিল কংক্রিটের স্লাব দিয়ে ঢাকা। নির্মাণ শ্রমিকেরা স্লাবের অংশবিশেষ ভেঙে তুলতেই কুয়ার মুখ থেকে তিনটি মাথার খুলি এবং বেশ কিছু হাড়গোড় দেখতে পান। পরদিন খনন করতে গিয়ে আরও একটি মাথার খুলি এবং কিছু হাড়গোড় পাওয়া যায়। মসজিদ কমিটি বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করলেও তা ছড়িয়ে পড়ে। একাত্তরের স্মৃতি পরিষদ নামের একটি সংগঠন সেখান থেকে মাথার খুলি ও হাড়গুলো সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে দেয়। এর তিনদিন পরে ৩১ জুলাই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে পরিত্যক্ত কুয়াটিতে খনন কাজ শুরু করে। ১২ আগস্ট মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। ৩১ জুলাই থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খননে স্বাধীনতার ২৮ বছর পরে আবিষ্কৃত হয় এক অজানা বধ্যভূমি, মুসলিম বাজার বধ্যভূমি। এই কুয়াতে পাওয়া গিয়েছিল ৫টি মাথার খুলি, ৬০০র বেশি হাড়। কিন্তু এই বধ্যভূমির কোনো চিহ্নমাত্রও নেই। মসজিদের ভেতরে থাকা সাদা রঙের টাইলসের পিলারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কালো রঙের টাইলসের পিলার জানান দেয় এর অস্তিত্ব। মসজিদের দক্ষিণ পশ্চিম কোণের পিলারটির জায়গাতেই ছিল পরিত্যক্ত কুয়াটি।

জহির রায়হানকে যে গুলি করে হত্যা করে বিহারীরা লাশ গুম করেছিল তা প্রমাণিত। জহির রায়হান যে বিহারীদের হাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তা সত্য। তবুও দিনের পর দিন নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সৃষ্টি হয়েছে। বিভ্রান্ত করা হয়েছে মানুষকে।

এই বধ্যভূমি আবিষ্কার এবং প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ জহির রায়হানকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণাকে পরিবর্তন করে ‘নিহত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। প্রায় ২৮ বছর ধরে একটি জাতীয় রহস্য হিসেবে বিবেচিত জহির রায়হানের অন্তর্ধানের ঘটনা ১৯৯৯ সালের এই আবিষ্কারের মাধ্যমে একটি নতুন মোড় নেয়। এই দেরিতে হলেও প্রাপ্ত প্রমাণাদি কেবল তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা দেয় না, বরং এটি তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে সত্য উন্মোচনের সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে। যদি এই প্রমাণগুলো আগে পাওয়া যেত বা সক্রিয়ভাবে অনুসন্ধান করা হতো, তবে হয়তো রহস্যটি এত দীর্ঘস্থায়ী হতো না।

হত্যার নেপথ্যে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বঃ

জহির রায়হানের হত্যার পেছনের কারণ এবং জড়িত পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রচলিত আছে,যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের অংশ।

ক. বিহারী/রাজাকারদের হাতে হত্যাকাণ্ডঃ এই তত্ত্ব অনুযায়ী, জহির রায়হান মিরপুর অভিযানে অবাঙালি/পাকিস্তানি সমর্থক বিহারী ও রাজাকারদের অতর্কিত হামলায় নিহত হন। মিরপুর তখনো পাকিস্তানী সমর্থক বিহারীদের হাতে ছিল। ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে মিরপুর মুক্তকরণ অভিযানের সময় অবাঙালিদের অতর্কিত হামলায় জহির রায়হানসহ ৪২ জন সেনাসদস্য নিহত হন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন যে, একজন সাংবাদিককে (জহির রায়হান) ৬-৭ জন অবাঙালি হাত-ঘাড়-কোমর ধরে টেনে নিয়ে যায় পানির ট্যাংকের পশ্চিম দিকে। এই তত্ত্বের সমর্থকরা নিশ্চিত যে রাজাকার আল বদররাই জহির রায়হানকে হত্যা করেছিলেন। তাদের ভয় ছিল জহির রায়হান বেঁচে থাকলে তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট তৈরি করবেন।

খ. বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের জের: জহির রায়হান বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন এবং সেই কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এই কমিটি গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী গণহত্যার নির্দেশদাতা, বাস্তবায়নকারী ও জড়িত এদেশীয় আলবদর ও রাজাকারদের পরিচয়, অসংখ্য গোপন তথ্য ও ডকুমেন্টস উদ্ঘাটন করেছিল। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, তাঁর হাতে থাকা সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের আশঙ্কায় রাজাকাররা তাঁকে হত্যা করে।

গ. অন্যান্য অপ্রচলিত বা বিতর্কিত তত্ত্ব: কিছু থিওরি অনুযায়ী, পাক হানাদার বাহিনীর কিছু সদস্য ছদ্মবেশে তাঁকে লুকিয়ে আটক করে হত্যা ও গুম করে ফেলে। কেউ কেউ ভারতীয় বাহিনীর লুটপাট বা তাজউদ্দিনদের “কুকীর্তি” সম্পর্কে জহির রায়হানের প্রামাণ্যচিত্র তৈরির ইচ্ছাকে তাঁর হত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে, এই তত্ত্বগুলো মূলধারার গবেষণা বা প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ দ্বারা তেমন সমর্থিত নয় এবং প্রায়শই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বিবেচিত হয়।জহির রায়হানের হত্যার পেছনের কারণ হিসেবে একাধিক তত্ত্বের উপস্থিতি নিছকই একটি একক কারণের অভাবকে নির্দেশ করে না, বরং এটি একটি জটিল, বহুস্তরীয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয় যেখানে বিভিন্ন পক্ষ জড়িত থাকতে পারে বা তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। এই তত্ত্বগুলোর মধ্যে কিছু পরস্পরকে সমর্থন করে (যেমন, বিহারী/রাজাকারদের দ্বারা হত্যাকাণ্ড এবং বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের জের – কারণ রাজাকাররাই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল)।

জহির রায়হান ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুর মুক্তকরণ অভিযানের সময় বিহারী/রাজাকারদের অতর্কিত হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু সম্ভবত তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্ধানে “রফিক” নামের এক অজ্ঞাত কলের ফাঁদে পড়ে মিরপুরে যাওয়ার কারণ ছিল, যা একটি সুপরিকল্পিত ফাঁদ ছিল।

Visited 11 times, 11 visit(s) today