ঢাকা, ১৮ই নভেম্বর, ২০২৪ — সোমবার মুডি’স ইনভেস্টরস সার্ভিস বাংলাদেশ সরকারের ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে, যার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কমে যাওয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিটি দেশের রেটিং B1 থেকে B2-এ নামিয়ে নিয়েছে এবং অবস্থানকে স্থিতিশীল থেকে নেগেটিভে বা অস্থিতিশীলে পরিবর্তন করেছে।
মুডি’সের রেটিং কমানোর পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে প্রভাব পড়ছে, তা সরকারের তারল্য ঝুঁকি, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জকে বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সংকট দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অশান্তির ফলে তীব্র হয়েছে, যা সরকারের পরিবর্তন এর কারনে ঘটেছে। মুডি’সের প্রতিবেদনে বলা হয়ঃ
“এই রেটিং কমানো হয়েছে রাজনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং কম প্রবৃদ্ধির ফলস্বরূপ, যা সরকারের তারল্য ঝুঁকি, বৈদেশিকমুদ্রা সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে,”
এজেন্সি আরও বলেছে যে, চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশকে তার বাজেট ঘাটতি মেটাতে বেশিরভাগ সময় স্বল্পমেয়াদি অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা তারল্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এছাড়া, মুডি’সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ত্রুটিপূর্ণ মূলধন এবং তারল্যতা সংকট আরও গভীর হচ্ছে, এবং এই অবস্থায় সম্পদের গুণগত মানের ঝুঁকি বাড়ছে, যা সরকারী দায়ের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
যদিও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ বিতরণ বেড়েছে, তবে মুডি’সের মতে, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের অবনতির কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিকমুদ্রা’র ঝুঁকি শক্তিশালী অবস্থানে নেই। অক্টোবর ২০২৪ পর্যন্ত, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ১৯.৮ বিলিয়ন ডলার, যা তিন মাসের আমদানি মেটানোর জন্য যথেষ্ট, তবে জুন ২০২৪-এ তা ছিল ২১.৭ বিলিয়ন ডলার।
এছাড়া, ফিচ রেটিংস নামক আরেকটি সংস্থা মে মাসে বাংলাদেশের সোভেরেন রেটিং বা কার্যকারিতা’র কমিয়ে দিয়েছিল, যদিও বাংলাদেশ গত বছর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পেয়েছিল।
মুডি’সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সামাজিক ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায়, দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, যা রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, নির্বাচনের বিষয়ে কোনও স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকা, সামাজিক অস্থিরতা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক উত্তেজনা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেঃ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও অন্তর্বর্তী সরকার একটি বিস্তৃত সংস্কার কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতা সম্পর্কে এখনও সন্দেহ রয়েছে।
“যদি সরকার দ্রুত ফলাফল প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, যেমন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বেকারত্ব মোকাবিলা, তবে তাদের রাজনৈতিক পুঁজি হারিয়ে যেতে পারে,”
মুডি’সও আগামী ২০২৫ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশে নামিয়ে দিয়েছে, যা পূর্বে ৬.৩ শতাংশ ছিল। এই সংশোধিত পূর্বাভাস দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে এসেছে, যার মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি এবং স্লথ প্রবৃদ্ধি অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং কমানো দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর এক বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক সংকটের মধ্যে দেশের ভবিষ্যত আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
