❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ১৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৮ হাজার ১৬৬ টাকা থেকে ৫৫ হাজার ১৩০ টাকায় গিয়ে পৌঁছাবে। একই সময়ে দেশে অর্জিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত ভঙ্গুর রূপ নেওয়ার পাশাপাশি একাধিক কাঠামোগত দুর্বলতা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে আটকে রাখছে। ফলে দীর্ঘায়িত হওয়ার মুখে পড়েছে দেশের অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় এসব আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে।
একদিকে বেড়ে চলেছে বৈদেশিক ঋণ। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন, শত শত কারখানা বন্ধ। রপ্তানি কার্যাদেশ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। অর্থ সংকট দেখিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থবির অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যদিকে শুধুমাত্র মার্কিন সরকারকে খুশি করতে ১৪টি বোয়িং ক্রয় করা হচ্ছে। একইসাথে উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে চীন থেকে ২০টি জে-১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার। যুদ্ধবিমান ক্রয়ে খরচ হবে প্রায় ২.১৪ থেকে ২.৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার সমান।
সোমবার সিপিডি আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে বৈদেশিক ঋণের এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ ও সার্বিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
ড. দেবপ্রিয় তার উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন, ব্যাংক ঋণের হার ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩.৮ শতাংশে পৌঁছেছে এবং জনপ্রতি বৈদেশিক ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান সরকার এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছে যার ব্যাংক খাত অত্যন্ত ভঙ্গুর, রাজস্ব আদায় দুর্বল, প্রবল রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগ মন্দাগ্রস্ত।
এর পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিবেশও বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। তবে স্পষ্ট কোনো অর্থনৈতিক ভিত্তি ও সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির অনুপস্থিতির কারণে অগ্রগতির সঠিক মূল্যায়ন এবং পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উপস্থাপনায় নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসের পারফরম্যান্স দুটি প্রধান প্রত্যাশার নিরিখে মূল্যায়ন করা হয়— প্রথমত, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতির মোড় ঘোরানো; এবং দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করা।
সিপিডি সুশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংকিং, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা—এই ৯টি খাতে সরকারের ৩৬২টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ পর্যালোচনা করেছে।
তবে বাস্তবায়িত পদক্ষেপগুলোর ওপর জোর দিয়ে তৈরি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এই স্কোরকার্ডে মিশ্র চিত্র এলেও ইতিবাচক অর্জনের চেয়ে নেতিবাচক প্রবণতার পাল্লাই ভারী দেখা গেছে। মূল্যায়িত সূচকগুলোর মধ্যে ১২টিতে উন্নতি হলেও ১৯টিতে অবনতি ঘটেছে।
বৈদেশিক দেনা ও লেনদেনের ক্ষেত্রে সার্বিক চিত্র বেশ নাজুক। সিপিডির পর্যালোচনা অনুযায়ী, দেশের বাণিজ্য ঘাটতি ৬.৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০.৪ বিলিয়ন (১০ হাজার ৪০০ মিলিয়ন) ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। চলতি হিসাবের ভারসাম্য ১.৩ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত থাকার বদলে ০.৬ বিলিয়ন ডলার ঘাটতিতে (ঋণাত্মক) চলে গেছে।
এছাড়া প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধির হার ২১.৪ শতাংশ থেকে কমে ১১.৮ শতাংশে নেমেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে গড় মাসিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫-এ নেমে এসেছে।
অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ খাতেও মন্দার প্রভাব স্পষ্ট। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, আর নিট এফডিআই (বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ) প্রবাহ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা ১৪.৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক (১৩.৬ শতাংশ) হারে দাঁড়িয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় বিনিয়োগ মন্দার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন সরাসরি কাজ হারিয়েছেন।
এর ফলে সামগ্রিক শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমে এসেছে এবং উৎপাদনমুখী খাতের প্রবৃদ্ধিও শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে।
যদিও মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে—সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ৯.১ শতাংশ থেকে কমে জুলাইয়ে ৮.৩ শতাংশে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩ শতাংশ থেকে কমে ৭.২ শতাংশে নেমেছে—তা সত্ত্বেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো চড়া এবং প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক রয়ে গেছে।

