আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম প্রয়াণ দিবস। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ৭৭ বছর বয়সে চিরতরে নীরব হয়ে যান বাংলা সাহিত্যের এই মহান সৃষ্টিশীল পুরুষ। আজ তাঁর মহাপ্রয়াণের অর্ধশতক পূর্ণ হলো।
১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল। ভাইবোনদের অকালমৃত্যুর তীব্র অভাবের সংসারে জন্ম নেওয়া এই শিশুর ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। মাত্র ১০ বছর বয়সে পিতৃহীন হয়ে তিনি গ্রামের মক্তবে মুয়াজ্জিন ও শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। পেটের দায়ে আসানসোলের রুটির দোকানে মাসে মাত্র ১ টাকা ১২ আনা বেতনে কাজ করা সেই ছেলেই পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ‘৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টন’-এ হাবিলদার হিসেবে যোগ দেন।
ব্রিটিশ বিরোধী সাহিত্য সৃষ্টির অপরাধে কারারুদ্ধ হয়ে তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে টানা ৩৯ দিন অনশন করেন। সেই সংকটে দূর থেকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বার্তা পাঠিয়েছিলেন, “Our literature is claiming you.”
কবি একাধারে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন ‘বিদ্রোহী’ হয়ে, অন্যদিকে তাঁর হৃদয়ে বিরাজ করছিল গভীর মরমী সুফি চেতনা। শৈশবের মক্তব ও লেটো দলের অভিজ্ঞতা এবং সুফি সাধকদের সান্নিধ্যে তাঁর লেখা থেকে জন্ম নেয় কালজয়ী সব গজল ও ইসলামী গান।
“ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়—আয় রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়”
একদিকে যেমন শ্যামাসংগীত ও কীর্তন রচনা করেছেন, অন্যদিকে সৃষ্টি করেছেন হৃদয়স্পর্শী হামদ ও নাত। জাত-পাত ও ধর্মের দেয়াল ভেঙে সাম্য ও মানবতার জয়গান গাওয়াই ছিল তাঁর জীবনের মূল বার্তা।
১৯৭২ সালের মে মাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কূটনৈতিক ও মানবিক উদ্যোগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহযোগিতায় কবিকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ২৪ মে তেজগাঁও বিমানবন্দরে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তাঁকে বরণ করে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ধানমণ্ডিতে ‘কবি ভবন’ প্রদান এবং ১৯৭৪ সালে তাঁকে ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদায় ভূষিত করা হয়।
সাহিত্য জীবনে মাত্র ২৩ বছর সক্রিয় থাকলেও তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে দিয়ে গেছেন এক অসামান্য সম্পদ। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই কবিকে সমাহিত করা হয়, যা আজ তাঁর অমর স্মৃতির চিহ্ন হিসেবে বিদ্যমান।
