– মৃণ্ময় সেন
দেশের চলমান রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিস্ময়কর ও চমকপ্রদ মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীকে একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা থেকে রুখতে বিএনপি পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন ও মাঠে প্রত্যাবর্তন চাইছে।
দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতকে নিজেদের রাজনৈতিক ‘দাবার ঘুঁটি’ এবং মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে আসা বিএনপি এখন এই শক্তিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগছে। এই শক্তিক্ষয় রোধ করতেই আওয়ামী লীগকে দৃশ্যপটে ফিরিয়ে এনে জামায়াতকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার এক অভিনব কৌশল বিএনপি নিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তিন দফা সমঝোতার প্রচেষ্টা
নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি ইতোমধ্যে অন্তত তিনবার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে যোগাযোগ করেছে।
প্রথম প্রচেষ্টা (ইউনূস সরকারবিরোধী আন্দোলন)
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস যখন নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করছিলেন, তখন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির একটি দল আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যৌথ আন্দোলনের প্রস্তাব দেয়।
সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের একাংশ এতে উৎসাহিত হলেও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন।
দ্বিতীয় প্রচেষ্টা (নির্বাচনী সমঝোতা)
জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি পুনরায় প্রস্তাব দেয় যেন আওয়ামী লীগ তাদের কর্মীদের বিএনপিকে ভোট দেওয়ার নির্দেশ দেয়, যার বিনিময়ে ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।
কিন্তু শেখ হাসিনা এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন এবং জনগণকে ভোট বর্জনের ডাক দেন, যা রাজনৈতিকভাবে সফল হয়।
সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা (জামায়াত দমনের প্রস্তাব)
সর্বশেষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের কাছে প্রস্তাব পাঠান যে, আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে এবং তারা মাঠে নেমে জামায়াত ও এনসিপিকে শায়েস্তা করলে সরকার নীরব থাকবে।
তবে শর্ত ছিল—আগামী পাঁচ বছর বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন করা যাবে না।
বর্তমান শক্তিশালী অবস্থানে থাকা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমানের বিএনপির সঙ্গে কোনো আপস হবে না। তবে তারেক রহমানকে বাদ দিলে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
জামায়াত ঠেকানোই মূল লক্ষ্য?
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে ধারনা করা হচ্ছে, জামায়াতকে একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না দেওয়াটাই এখন বিএনপির প্রধান লক্ষ্য। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সরকারের যে কঠোর অবস্থান—পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবি মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ—দেখা যাচ্ছে, তা মূলত আওয়ামী লীগকে চাপে রেখে নিজেদের শর্তে রাজি করানোর একটি প্রচেষ্টা।
বিএনপি কোনো অবস্থাতেই ক্ষমতা হাতছাড়া করতে চায় না। জামায়াতকে ভয়ের মুখে রেখে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল হিসেবেই বিএনপি যে কোন কিছু করতে উন্মুখ হয়ে আছে। রাজপথে ও রাজনীতির মাঠে জামায়াতে ইসলামী কে চাপের রাখার সাংগঠনিক সক্ষমতা বিএনপির নেই, এই কারনেই তারা আওয়ামী লীগকে মাঠে ফেরাতেও প্রস্তুত। তবে শেখ হাসিনার দৃঢ় অবস্থান এবং ‘তারেক রহমান বর্জন’-এর পাল্টা শর্ত বিএনপির এই কৌশলকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
আগামী দিনের রাজনীতিতে এই ‘বিপরীতমুখী সমীকরণ’ কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
