মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় নিস্প্রভ সরকার: কার ইশারায় কাঁদছে ইতিহাস?

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় নিস্প্রভ সরকার: কার ইশারায় কাঁদছে ইতিহাস?
শেয়ার করুন

বিডি ডাইজেস্ট প্রতিবেদন

কথিত গণ-অভ্যুত্থানের পর মেটিকুলাস ডিজাইন করে নতুন বাংলাদেশে গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন সাধারণ মানুষ ইউনূস গং। সেই সময়েই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পিত ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

রাজনৈতিক মহল ও বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে ছিল মৌলবাদী একটি চক্র। যারা পাকিস্তানি মদদপুষ্ট। অনেক আশা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা চেয়েছিলেন শহীদ জিয়ার দল বিএনপি ক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের গর্ব ও সম্মান পুনরুদ্ধার করবে। কিন্তু বাস্তবে জামায়াতে ইসলামীর কৌশলগত চাপের কাছে নতজানু হয়ে বিএনপি সরকার এখনো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কোনো দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেনি।

যা দেশের প্রগতিশীল ও মুক্তমনা মানুষকে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করেছে।

১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল যেখানে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নিয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক আম্রকাননের স্মৃতিকেন্দ্রে এখন কেবল ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন। দেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দেওয়া ‘গার্ড অব অনার’-এর ভাস্কর্যটির হাত ভাঙা, আনসার সদস্যদের রাইফেলগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য থেকে শুরু করে ১১টি সেক্টরের মানচিত্র—সবই এখন ভাঙচুর ও অযত্নের শিকার। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল এই কমপ্লেক্সেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬১ লক্ষ টাকা।

সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের বিকেল থেকে ১৪ই আগস্টের মধ্যে ৫৯টি জেলায় প্রায় ১,৪৯৪টি ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে।

এর মধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে থাকা ১১৩টি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সও রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে, এই কমপ্লেক্সগুলো সংস্কারে প্রয়োজন অন্তত ২০ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। তবে অর্থ সংকটের অজুহাতে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ থমকে আছে।

অভিযোগ উঠেছে, ৫ই আগস্টের পর একটি বিশেষ চক্র পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মুছে দিতে এই হামলাগুলো চালিয়েছে।

অনেকের ধারণা ছিল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের দল হিসেবে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান পুনরুদ্ধারে তারা শক্ত ভূমিকা রাখবে। কিন্তু গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি জিয়াপুত্র তারেকের সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, এসব ভাস্কর্যের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ তাদের পছন্দমতো তৈরি করেছে, যেখানে “ইতিহাসের প্রকৃত চিত্র” আসেনি। এই অজুহাতে সংস্কার কাজ থমকে ছিল।

বর্তমান সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি জেনে-বুঝে ব্যবস্থা নেবেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিত্র দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বা কৌশলগত কারণে বিএনপি এখনো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সেই ‘শক্ত অবস্থান’ নিতে পারছে না। যা স্বাধীনতাকামী ও মুক্তমনা মানুষকে হতাশ করছে।

যশোরের বাঘারপাড়ায় চিত্রা নদীর পাড়ে থাকা স্বাধীনতা চত্বরটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে দোকান তুলেছিলেন স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মী। যদিও পরে সেগুলো সরানো হয়েছে। কিন্তু জায়গাটি এখন ইজিবাইক স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ নিয়ে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, স্বাধীনতার স্মৃতি রক্ষায় সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমরা ভেবেছিলাম দেশ স্বাধীনভাবে শ্বাস নেবে, কিন্তু আমাদের গর্বের স্মৃতিগুলো এভাবে ধুলোয় মিশে থাকবে তা কল্পনাও করিনি।

মুজিবনগর থেকে যশোর—সবখানেই এখন কেবল অবহেলার ছবি। অর্থ মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠ চালাচালির মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের দৃশ্যমান দলিলগুলো।

যদি দ্রুত এই ভাস্কর্য ও কমপ্লেক্সগুলো সংস্কার করা না হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।

Visited 17 times, 1 visit(s) today