❐ বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সরকারি অর্থব্যবস্থায় এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। উন্নয়ন ব্যয় কমিয়েও ঋণের চাপ কমেনি; বরং রাষ্ট্রকে নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটাতেই ঋণ নিতে হয়েছে। অর্থাৎ বেতন-ভাতা, সুদ, ভর্তুকি ও প্রশাসনিক খরচ চালাতে রাজস্ব আয় যথেষ্ট হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে প্রথম বাজেটই হয়ে উঠছে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সমন্বয়ের কঠিন পরীক্ষা।
উন্নয়ন নয়, টিকে থাকার অর্থনীতি
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, অথচ পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাদ দিয়েও দৈনন্দিন প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। শুধু পরিচালন ব্যয় সামাল দিতেই সরকারকে ২৩ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা ঋণ নিতে হয়েছে—যা চার দশকের মধ্যে বিরল ঘটনা বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এই চিত্র তুলে ধরে ‘এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ’-এর এক আলোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাষ্ট্র এখন এমন এক আর্থিক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে উন্নয়ন নয়, টিকে থাকাই বড় প্রশ্ন। আশির দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ–এর সময়ের পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঋণের স্ফীতি: উন্নয়ন কম, দায় বাড়তি
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ডেটা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই সময়ে উন্নয়ন ব্যয় ছিল সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যা কয়েক বছর আগের তুলনায়ও কম। অর্থাৎ উন্নয়ন কমালেও ঋণ কমেনি; বরং বেড়েছে। এর বড় অংশই এসেছে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও পূর্ববর্তী দায় সামাল দিতে।
বৈদেশিক ঋণ ও মুদ্রার চাপ
২০২২ সালের জুনে বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৫১ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকায়—প্রায় দ্বিগুণ। এই সময়ে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–সহ উন্নয়নসহযোগীদের কাছ থেকে ৩৪৪ কোটি ডলার বাজেটসহায়তা নিয়েছে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বৈদেশিক ঋণ টাকায় রূপান্তর করলে দায় আরও বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের পরিশোধ সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করবে।
ব্যাংকনির্ভর ঋণ ও বিনিয়োগ সংকোচন
অভ্যন্তরীণ ঋণের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা; ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। ট্রেজারি বন্ড ও বিলের মাধ্যমে ধারগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে। ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ৬ শতাংশের নিচে—যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগজনক। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বাড়লে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঋণ থেকে বঞ্চিত হন এবং প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়।
প্রথম বাজেটে প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
নতুন সরকারের সামনে রয়েছে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাপ—স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, কৃষিঋণ মওকুফ, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ ও নতুন বেতন কাঠামো। কিন্তু রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সীমিত থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় সরাসরি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নেই অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে রাজস্ব সংস্কার ছাড়া ব্যয় সম্প্রসারণ টেকসই হবে না।
কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া উপায় নেই
বর্তমান সংকট সাময়িক নয়—এটি দীর্ঘদিনের রাজস্ব দুর্বলতার ফল। করজাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট ও আয়কর প্রশাসনের ডিজিটাল সংস্কার, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ এবং প্রত্যক্ষ করের অংশ বাড়ানো ছাড়া রাজস্ব ঘাটতি কমানো কঠিন।
ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ ও প্রকল্প মূল্যায়ন। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার চেয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার না দিলে ঋণের চাপ আরও ঘনীভূত হতে পারে।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট তাই কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি হবে আর্থিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন এবং নীতিগত সক্ষমতার একটি বাস্তব পরীক্ষা।
