জামাত ঠেকাতে নানা শ্রেণী-ধর্মের ভোট বিএনপি’র বাক্সে: বিশাল জয়ের আড়ালে যে ‘অস্বস্তি’

জামাত ঠেকাতে নানা শ্রেণী-ধর্মের ভোট বিএনপি’র বাক্সে: বিশাল জয়ের আড়ালে যে ‘অস্বস্তি’
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগবিহীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ভূমিধস জয় পেলেও ফলাফলের ভেতরে লুকিয়ে আছে জটিল এক সমীকরণ। মাঠের একপাশ কার্যত ফাঁকা থাকায় ভোটের বড় অংশ ভাগাভাগি হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।

কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে—বিএনপির এই জয়ের পেছনে শুধু দলীয় ভোট নয়, বরং জামায়াতকে ঠেকাতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা, এমনকি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভোটারদের কৌশলগত সমর্থন বড় ভূমিকা রেখেছে।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারাতে ‘নৌকা জিতলে মসজিদে উলুধ্বনি বাজবে’, ‘আওয়ামী লীগ দেশ ভারতের কাছে বিক্রি করে দিবে’সহ প্রোপাগাণ্ডা ছড়িয়ে জয় পায় বিএনপি-জামায়াত জোট।

অথচ এবার ছিল ভিন্ন পরিস্থিতি, এক সময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতের কর্মী-সমর্থকেরা এবার বিএনপি ভারতের কাছে ‘মাথা বিক্রি’র অভিযোগ তুলে ভোটের মাঠে হারানোর চেষ্টা করে।

আর এখানেই ভবিষ্যতের অস্বস্তির ইঙ্গিত দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ববি হাজ্জাজ: প্রতীক নয়, কৌশলের জয়

বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের ছেলে ববি হাজ্জাজ প্রথমে পরিচিতি পান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের উপদেষ্টা হিসেবে। পরে তিনি ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) গঠন করলেও রাজনৈতিকভাবে বড় সাফল্য পাননি।

হঠাৎ করেই বিএনপি তাকে ঢাকা-১৩ আসনে মনোনয়ন দেয়। ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করতে নিজের গড়া দলও ছাড়েন তিনি।

এই আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলামের আলোচিত নেতা মামুনুল হক। গোঁড়া ইসলামী অবস্থান ও নানা বিতর্কের কারণে তিনি আলোচনায় ছিলেন।

নির্বাচনের আগে ধারণা ছিল, মামুনুলই জয়ী হবেন। কিন্তু ভোটের কয়েকদিন আগে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসে জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের একটি পোস্ট—যা পরে দলটির পক্ষ থেকে ‘হ্যাক’ দাবি করা হয়। সন্দেহ-অবিশ্বাসের এই আবহে মোহাম্মদপুরের বহু ভোটার প্রকাশ্যে লেখেন, “প্রার্থী যেই হোক, জামায়াতকে ঠেকাতে ধানের শীষে ভোট দেব।”

ফলাফল: প্রায় তিন হাজার ভোটের ব্যবধানে ববি হাজ্জাজ জয়ী। স্থানীয়ভাবে অনেকটাই অচেনা এক প্রার্থী জয় পেলেন কৌশলগত ভোটে।

শুধু একটি আসন নয়, জাতীয় চিত্র

এমন ঘটনা একক নয়। এক বাম দলের প্রার্থী, যিনি আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার অর্ধেকেরও কম ভোট পেয়েছেন, জানান—তার বহু সমর্থকই জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন।

এই প্রবণতা বিভিন্ন আসনে দেখা গেছে। সংস্কৃতিকর্মী, বাম সমর্থক, এমনকি অতীতে আওয়ামী লীগে ভোট দেওয়া ভোটারদের একটি অংশও ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন—একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা ঠেকাতে।

ভূমিধস জয়, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীও শক্তিশালী

ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন—সরকার গঠনে তাদের কারো মুখাপেক্ষী হতে হবে না।

এই ফল অনেককে মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০০৮ সালের নির্বাচনকে, যখন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয়ী হয়েছিল। সেবার বিএনপি জিতেছিল ৩০টি আসনে, যদিও ভোট পেয়েছিল ৩০ শতাংশের বেশি।

তবে এবারের বড় পার্থক্য—জামায়াতের উত্থান। তারা এককভাবে জিতেছে ৬৮টি আসনে; জোটসঙ্গীদের নিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৭। সংসদে এত বেশি আসন আগে কখনও পায়নি দলটি। ১৯৯১ সালে তাদের সর্বোচ্চ ছিল ১৮টি আসন।

জামায়াতের এই উত্থান আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরও দৃষ্টি কেড়েছে।

ভোটের হার ও অনুপস্থিতির রাজনীতি

২০০৮ সালে ভোট পড়েছিল ৮৭ শতাংশের বেশি। এবার ভোটের হার ৫৯ শতাংশ।

ধারণা করা হচ্ছে, জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নিষেধাজ্ঞায় পড়া আওয়ামী লীগের বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে যায়নি। সাধারণত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটভিত্তি গড়ে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি ধরা হয়। সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের ভোট যেদিকে হেলে পড়ে, ক্ষমতা যায় সেদিকে।

এবার সেই ভাসমান ভোটের বড় অংশ গেছে বিএনপির ঘরে—কিন্তু তা পুরোপুরি আদর্শিক সমর্থন নয়, বরং কৌশলগত।

সীমান্ত ও উত্তরাঞ্চলে জামায়াতের বিস্তার

ভোটের মানচিত্র বলছে, সাতক্ষীরা থেকে নওগাঁ পর্যন্ত সীমান্তবর্তী এলাকায় জামায়াত উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। রংপুর অঞ্চলে জাতীয় পার্টির ঐতিহ্যগত ঘাঁটিও তারা দখলে নিয়েছে।

জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিলেও কোনো আসনে জিততে পারেনি।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে ইসলামাইজেশনের প্রবণতা দৃশ্যমান, তাতে বিএনপির সামনে নতুন প্রতিযোগী তৈরি হয়েছে—ডানপন্থী একই পরিসরে।

বিএনপির কৌশল ও সীমাবদ্ধতা

নির্বাচনের শেষদিকে বিএনপিকে বিভিন্ন আসনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সমর্থন চাইতে হয়েছে। তারেক রহমান বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের সবাইকে নির্বিচারে হয়রানি করা হবে না। মির্জা ফখরুল আলমগীরও একই বার্তা দিয়েছেন।

কিছু আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটেই বিএনপি প্রার্থীরা জিতেছেন বলে আলোচনা রয়েছে।

বিএনপি মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবেই পরিচিত। প্রচারণায় ধর্মীয় আবহও ছিল স্পষ্ট। ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারে স্থানীয় নেতারা বলেছেন—‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে না।

ধর্মের কার্ড বিএনপি আগেও খেলেছে, তবে তখন জামায়াত ছিল তাদের মিত্র। এবার দুই দল আলাদা শিবিরে, কিন্তু আদর্শিক পরিসর প্রায় অভিন্ন।

অস্বস্তির কারণ: এই ভোট কি স্থায়ী?

ভোটের পরিসংখ্যান বলছে, ভোটারদের অর্ধেকের কিছু বেশি ভোট দিয়েছেন। সেই ভোট ভাগ হয়েছে মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।

অন্য প্রায় অর্ধেক ভোটার—যার বড় অংশ আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীল সমর্থক—ভোট দেননি। অর্থাৎ বিএনপির বিশাল জয়ের পেছনে রয়েছে দুই ধরনের ভোট: নিজস্ব সমর্থক ভোট, জামায়াত ঠেকাতে কৌশলগত ভোট।

এই দ্বিতীয় অংশটিই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারণ। যদি বিএনপি মধ্য-ডান অবস্থান থেকে সরে না আসে, তবে একই পরিসরে জামায়াতের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা বাড়বে। মাঠের একপাশ ফাঁকা থাকলেও অন্য পাশে কাড়াকাড়ি চলছে—আর সেই লড়াই সহজ হবে না।

নির্বাচনের প্রচারে বিএনপি একাত্তর, নারী স্বাধীনতা ইস্যু সামনে এনেছে জামায়াতকে চাপে রাখতে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিভাজন আরও স্পষ্ট

এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনরেখাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

একদিকে ইসলামপন্থী উত্থান, অন্যদিকে মধ্য-ডান শক্তির ক্ষমতায় ফেরা। কিন্তু প্রগতিশীল অংশের অনুপস্থিতি ভবিষ্যতের রাজনীতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

বিএনপি বিশাল জয় পেয়েছে—কিন্তু সেই জয়ের ভেতরে রয়েছে স্পষ্ট বার্তা:
এটি কেবল দলীয় জয়ের গল্প নয়, বরং জামায়াতকে ঠেকাতে বিভিন্ন শ্রেণী-ধর্মের ভোটের অস্থায়ী সমাবেশ।

এই সমাবেশ টেকসই না হলে, আজকের বিজয়ই আগামী দিনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Visited 17 times, 1 visit(s) today