নিজস্ব প্রতিবেদক
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনুমোদিত নতুন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ বণ্টনে বড় ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। গত ১৮ মাসে অনুমোদিত ২ লাখ ১২ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের প্রায় ৪২ শতাংশ অর্থই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। বিপরীতে দেশের দারিদ্র্যপ্রবণ ও তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা একাধিক বিভাগ পেয়েছে অত্যন্ত সীমিত অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প বণ্টনে অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর প্রয়োজনকেও অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। তা না হলে আঞ্চলিক বৈষম্য আরও গভীর হতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের নথিপত্র অনুযায়ী, এই সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ২০টি সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবে ১৫৩টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়া চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য রাখা হয়েছে ৮৯ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা।
বরাদ্দের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঢাকা বিভাগ পেয়েছে ১৯ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৯.২৭ শতাংশ। খুলনা বিভাগে বরাদ্দ হয়েছে ১৩ হাজার ১২৮ কোটি টাকা (৬.১৭ শতাংশ)। সিলেট বিভাগ পেয়েছে ৫ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা (২.৫১ শতাংশ) এবং রংপুর বিভাগ পেয়েছে ৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২.৪৪ শতাংশ।
তবে উন্নয়ন বরাদ্দে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে রাজশাহী, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগ। রাজশাহীতে বরাদ্দ হয়েছে ২ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা (১.৩৮ শতাংশ), বরিশালে ১ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা (০.৮৬ শতাংশ)। সবচেয়ে কম বরাদ্দ পাওয়া ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৩৭৬ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ০.১৭ শতাংশ।
চট্টগ্রামেই বড় অঙ্কের প্রকল্প
চট্টগ্রাম বিভাগকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় ৪০টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি নতুন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ চট্টগ্রাম নগরীকেন্দ্রিক। বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ (ইআরএল-২)। প্রায় ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার ‘বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’, দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণে ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু, চট্টগ্রাম নগরীর পয়োনিষ্কাশন ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন
উন্নয়ন বরাদ্দে এই বড় ব্যবধান নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে সম্পদের সুষম বণ্টন ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তাঁর মতে, কোনো একটি অঞ্চলে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিলে তা অন্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলায়। যদিও সরকারিভাবে বরাদ্দে আঞ্চলিকতার কথা অস্বীকার করা হয়েছে, তবে প্রকল্প বণ্টনের বাস্তব চিত্র এই প্রশ্নকে উসকে দিয়েছে।
সরকারের ব্যাখ্যা
পরিকল্পনা কমিশনের সচিব এসএম শাকিল আখতার বলেন, প্রকল্প অনুমোদনে কোনো আঞ্চলিক বা ব্যক্তিগত বিবেচনা কাজ করেনি। তাঁর ভাষ্য, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বন্দরের কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই অর্থনৈতিক প্রয়োজন বিবেচনায় সেখানে বড় অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগের সরকারের সময় নেওয়া কিছু প্রকল্প বাতিল বা সংশোধন করা হয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকল্পগুলো জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
ঋণনির্ভর প্রকল্প নিয়েও আলোচনা
নতুন প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশ বাস্তবায়িত হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার ঋণে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকে ঋণনির্ভর প্রকল্প এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ায় নীতিগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
