বিশেষ প্রতিবেদক
যতই ঘনিয়ে আসছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় বেলা, ততই বেড়ে চলেছে চলমান প্রকল্পগুলোর ব্যয়। এমন তড়িঘড়ি করে বিভিপন্ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিকে ‘অস্বাভাবিক’ আখ্যা দিয়ে সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে। কেউ কেউ একে লুটপাটের মহোৎসব বলেও মন্তব্য করছেন।
সর্বশেষ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পটির ব্যয় ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা বাড়ানোর এই অনুমোদন দেওয়া হয় রোববার।
কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের ১৮ টন রুশ সরঞ্জাম পুড়ে ছাই
প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারপারসন ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্যয় বৃদ্ধির পুরো অর্থই প্রকল্প ঋণ থেকে সংগ্রহ করা হবে। এর ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা।
রূপপুর প্রকল্পে কলক্ষেপণ: ইউনূস সরকারের সিদ্ধান্তহীনতায় ব্যয় বাড়ল ১৩,৩৮৬ কোটি টাকা
রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় দুটি ইউনিটে প্রতিটিতে ১২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ান নাগরিকদের অস্বাভাবিক মৃত্যু থামছেই না
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প ব্যয়ের ১০ শতাংশ অর্থায়ন সরকারের এবং বাকি ৯০ শতাংশ রাশিয়া ঋণ হিসেবে দেবে বলে নির্ধারিত ছিল।
তবে সর্বশেষ একনেক সভায় সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ ১৬৬ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। এতে সরকারের অর্থায়নের অংশ নেমে এসেছে ২১ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকায়, যা আগে ছিল ২২ হাজার ৫২ কোটি টাকা।
সরকারি অর্থায়নে যে পরিমাণ অর্থ কমানো হয়েছে, সেটিও প্রকল্প ঋণ থেকেই সমন্বয় করা হবে। এর ফলে প্রকল্পে মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা, যা আগে ছিল ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্ধারিত কার্যকাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর, যা প্রয়োজনে আরও ২০ বছর বাড়ানো যাবে।
ইউনূস সরকারের সিদ্ধান্ত: রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ল আড়াই বছর, খরচ বাড়ল আরো ২৬,১৮১ কোটি টাকা
২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিনি প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের চুল্লি ও পানি শীতলকারী ডোমের কংক্রিট ঢালাই কাজের উদ্বোধন করেন।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের শুরুতেই একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কথা থাকলেও করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ বারবার পিছিয়ে যায়।
সর্বশেষ সংশোধিত অনুমোদনের ফলে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
একনেকে আরও ২৫ প্রকল্প অনুমোদন
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পসহ এবারের একনেক সভায় মোট ২৫টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প রয়েছে ১৪টি, সংশোধিত প্রকল্প ছয়টি এবং মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে পাঁচটি প্রকল্পের। এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ১৯১ কোটি টাকা।
একক প্রকল্প হিসেবে এই মোট ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য।
রূপপুরের একের পর এক বিদেশিদর রহস্যজনক মৃত্যু: জেগেছে নানা সন্দেহ এবং প্রশ্ন
এ ছাড়া একনেকে অনুমোদিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ‘রাঙামাটি (মানিকছড়ি)-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-১৬২) প্রশস্তকরণ ও মানোন্নয়ন’ প্রকল্প
- একই মন্ত্রণালয়ের ‘মুন্সীগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন তিনটি আঞ্চলিক ও একটি জেলা মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্প
- গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ প্রকল্প
- বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ে শক্তিবৃদ্ধিকরণ (প্রথম সংশোধিত)’ প্রকল্প
- একই মন্ত্রণালয়ের ‘চট্টগ্রামের পারকিতে পর্যটন সুবিধা সম্প্রসারণ (দ্বিতীয় সংশোধন)’ প্রকল্প
- স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ‘স্যানিটেশনে নারী উদ্যোক্তা’ প্রকল্প
- ‘কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্প
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্র, পুলিশ ক্যাম্প, নৌ-পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের স্থাপনা নির্মাণ’ প্রকল্প
- ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় নির্মাণ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প
- বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘দোহাজারী–রামু–কক্সবাজার হয়ে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ প্রকল্প
- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ‘৬৪ জেলায় শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি (প্রথম সংশোধন)’ প্রকল্প
- বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ‘সিলেট টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন’ ও ‘সিলেট টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট স্থাপন’ প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত)
- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষা’ প্রকল্প
- স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী ১ হাজার শয্যার জেনারেল হাসপাতাল স্থাপন’ প্রকল্প
- কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘আশুগঞ্জ–পলাশ সবুজ প্রকল্প’ এবং ‘স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট (এসএসিপি)’ (তৃতীয় সংশোধন)
- পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার নদীসমূহের টেকসই ব্যবস্থাপনা’, ‘মহানন্দা নদী ড্রেজিং ও রাবার ড্যাম’, ‘পদ্মা নদীর তীর সংরক্ষণ’, ‘তেতুঁলিয়া নদীর ভাঙন রোধ’ এবং ‘আড়িয়াল বিল এলাকার পানি ও ভূমি সম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্প।
