ভারতীয় ইলিশে দেশের বাজার সয়লাব, ১৯০ টাকার ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৮শ টাকায়!

ভারতীয় ইলিশে দেশের বাজার সয়লাব, ১৯০ টাকার ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৮শ টাকায়!
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব সংবাদদাতা


মৌসুমের শেষ দিকে এসে বাজারে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সংকট কাটেনি। এর মধ্যেই প্রথমবারের মতো ভারত থেকে বৈধ পথে ৫০০ টন এবং অবৈধ পথে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ঢোকার পর দেশের বাজার ভরে উঠেছে বিদেশি ইলিশে।

তবে আমদানির পাশাপাশি দেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ বাড়ায় চাঁদপুরের বাজারে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ইলিশের দাম কেজিতে কমেছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ আরও বাড়লে অভিযানের আগ পর্যন্ত ইলিশের দাম ধীরে ধীরে কমতে পারে।

যদিও বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, শুল্ক ও অন্যান্য খরচ পরিশোধের পর আমদানিকৃত ভারতীয় ইলিশের কেজিপ্রতি দাম পড়ছে গড়ে ১৮৫-১৯০ টাকার মতো। সেই ইলিশই দেশি ইলিশ বলে ১৭শ-১৮শ টাকায় বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা।

 

পাশাপাশি, নরম হয়ে যাওয়া, পুরনো ইলিশ কেটে ডিম বের করে পৃথকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে ৫-৬ হাজার টাকা কেজিতে। ডিম বের করে নেওয়া ইলিশ থেকে নোনা ইলিশ তৈরি করা হয়।

খুলনার খানজাহান আলী সড়কের বিশ্বাস ইন্টারন্যাশনাল এ বছর বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে ৬ হাজার ২৩১ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আমদানি মূল্য দেখিয়েছে ৭৪ থেকে ২৪৭ টাকা কেজি পর্যন্ত। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দীপ্ত বিশ্বাস বলেন, গুজরাট থেকে যেসব ইলিশ আসছে, সেগুলোর মান অনুযায়ী দাম এমনই।

এর চেয়েও কম দরে ইলিশ এসেছে বাংলাদেশে। যেমন, ঢাকার দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীর রুপা এন্টারপ্রাইজ ৭ হাজার ৭২৩ কেজি ইলিশ আমদানি করেছে ৫৭ টাকা কেজি ঘোষিত মূল্যে। কেজিতে প্রায় ২০০ টাকা শুল্ক–কর দিয়েছে।

বেনাপোলের মেসার্স সততা ফিশ ফিড ২৪ হাজার ৭০০ কেজি ইলিশ এনেছে ২৪৭ টাকা কেজি ঘোষিত মূল্যে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার শহিদুর রহমান বলেন, ইলিশ আমদানি করতে সব মিলিয়ে কেজিতে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়। একেকটি মাছের ওজন ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম। পাইকারিতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন। আর দেশের খুচরা বাজারে ৫০০–৭০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার টাকা কেজিতে।

চাঁদপুর বড়স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে বুধবার ৭০০ থেকে ৮০০ মণ ইলিশ উঠেছে। চাঁদপুরের নদীর পাশাপাশি নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, হাতিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে আসছে এসব মাছ। সরবরাহ বাড়ায় বাজারে আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, গত কয়েক দিন ধরে বড়স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও কমছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৩০০ টাকা, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ৫০০ গ্রামের ইলিশ প্রায় ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অভিযানের আগে ইলিশের সরবরাহ কমবে না বলে আশা করছেন তারা। ফলে প্রতিদিনই দাম কিছুটা করে কমতে পারে।

চাঁদপুর বড়স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবসায়ী বাদশা মালো বলেন, উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে বর্তমানে প্রচুর ইলিশ আসছে। মাছের আকার কিছুটা ছোট হলেও সরবরাহ বাড়ায় ব্যবসায়ীরা খুশি। অভিযান শুরুর আগ পর্যন্ত ইলিশের সরবরাহ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছেন তিনি।

পড়ুন: চাল-তেল-সবজি-কাঁচামালের পর এবার ভারত থেকে এলো সাড়ে ৩ লাখ কেজি ইলিশ! বাদ যাবে না কোনো পণ্য

তবে ভালো মানের ইলিশের দাম এখনো খুব একটা কমেনি বলে জানান এই ব্যবসায়ী। তার ভাষ্য, এক কেজি ওজনের তাজা ইলিশ এখনো ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর যেসব মাছে ডিম বেশি, সেগুলো ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

চাঁদপুর বড়স্টেশন আড়তের ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, পুরো মৌসুমজুড়েই ইলিশের সরবরাহ কম ছিল। তবে কয়েক দিন ধরে সরবরাহ বাড়ায় প্রতি কেজি ইলিশের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।

এদিকে দেশে ইলিশের সরবরাহ ও উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে ভারত থেকে ৫০০ টন ইলিশ আমদানির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, ভারত থেকে আসা ইলিশের মান দেশীয় ইলিশের তুলনায় ভালো নয়। এসব মাছের পেটে প্রচুর ডিম রয়েছে বলেও দাবি তাদের।

পড়ুন: ইলিশের জেলাতেই নাগালের বাইরে ইলিশ: ৩ মণ ধান বেচে মিলল ১ কেজি ইলিশ

ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, একসময় বাংলাদেশ থেকেই বিভিন্ন জায়গায় ইলিশ রপ্তানি করা হতো। এখন দেশের বাজারে দেশি ইলিশ নেই, ভারত থেকে ইলিশ আমদানির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ বছরও ইলিশের উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।

তিনি বলেন, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণগুলো নিয়ে ভালোভাবে গবেষণা করতে হবে। সমস্যা চিহ্নিত করে তা নিরসনে মৎস্য খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। পাশাপাশি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ড. আনিছুর রহমান আরও বলেন, জাতীয় মাছ ইলিশের সম্পদ কমে গেছে। বিশেষ করে বড় আকারের ইলিশ অনেক কমে গেছে। দ্রুত সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে আগামী দুই থেকে চার বছরের মধ্যে শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য মাছের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে অভয়াশ্রম, প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সরকারি প্রণোদনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে দীর্ঘদিন ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। তবে সর্বশেষ তিন বছরে উৎপাদন কমেছে ৭ শতাংশেরও বেশি।

পড়ুন: খোদ চাঁদপুরেই মধ্যবিত্তের নাগালের অনেক বাইরে সাধের ইলিশ, ডিমের কেজিও ৬ হাজার

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩৯ মেট্রিক টন। গত দুই দশকে বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন বাড়লেও ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ মেট্রিক টনে পৌঁছায়।

এরপর উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ মেট্রিক টনে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে ৫ লাখ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীদূষণ, শত শত ড্রেজারের মাধ্যমে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন কারণে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাবে দেশে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা কমছে। ফলে একদিকে বাজারে ইলিশের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে চাহিদা মেটাতে আমদানির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

Visited 3 times, 5 visit(s) today